আর্থসামাজিক ও প্রকৃতির ভারসাম্যের জন্য প্রয়োজন দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি। পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতেই সৃষ্ট বনভূমি। এক একটি গাছ যেন অক্সিজেন কারখানা। বন শুধু অক্সিজেনই তৈরি করে না, একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পশু-পাখির অভয়ারণ্য। গড়ে ওঠে প্রকৃতি ও প্রাণীর মেলবন্ধন। আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগেও ঢাকা ও এর আশপাশ ছিল সবুজের সমারোহ; কিন্তু আজ নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে সেতু ভবনসহ নানা স্থাপনা। প্রকৃতি হারিয়েছে নান্দনিকতা। বাসস্থান হারিয়েছে অনেক বানর। পুরান ঢাকার একই গল্প। এমনকি বলধা গার্ডেনও আজ মৃতপ্রায়। চারদিকে আকাশছোঁয়া উঁচু বাড়িঘর আড়াল করেছে ঢাকার এই ঐতিহ্য।
একটি পরম সত্য হলো- দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত প্রয়োজন গাছ ও কাঠের। সারা দেশে উন্নয়নের নামে, রাস্তা প্রশস্ত করার নামে কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য শতবর্ষী গাছ। অথচ পাশের দেশে সড়ক বা বাড়িঘর নির্মাণের পরিকল্পনায় কোনো শতবর্ষী গাছ পড়লে সেটি রক্ষার জন্য নকশাই বদলে ফেলা হয়। আমাদের দেশে একশ্রেণীর লোক আছে, কোথাও বড় গাছ দেখলে যাদের হাত-পা শির-শির করে, কখন কিভাবে গাছটিকে নিধন করবে! এর ফলে মহাসড়কগুলো আজ বিরান। উঁচু গাছে আশ্রয় নেয়া পাখিরা হারিয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে তাকালেই এর বাস্তবতা নজরে পড়তে বাধ্য। শুধু মহাসড়ক নয়, বিরান হয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলও। সেখানে বন কর্তাদের নাকের ডগায় গড়ে উঠেছে লোকালয়। বন হারাচ্ছে স্বাভাবিকতা, আর সম্পদ বাড়ছে কর্তাদের। ব্যক্তিগত লোভের কাছে পরাজিত সবুজের ক্যানভাস।
একসময় দেখা যেত, পাহাড়ের গায়ে সবুজের আস্তরণ, আর তার গায়ে লেগে থাকা মেঘের দল। সারাক্ষণ পাহাড় চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ত পানি। ছিল অসংখ্য প্রাকৃতিক ঝরনা। আজ পাহাড়গুলো বৃক্ষশূন্য রুক্ষ শুকনো মাটির স্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির সময় পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটছে প্রতি বছর। দেশের সীমান্ত অঞ্চলে বিশেষ করে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত অথবা বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সীমান্তেও একই দৃশ্য। বাংলাদেশ অংশে ১৫-২০ বছর আগেও যেসব বন ছিল, সেগুলো উধাও হয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে লোকালয়, হাটবাজার, কারখানা।
বন ধ্বংসের সবশেষ উদাহরণ গাজীপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বর্জ্যভাগাড় তৈরির মহৎ (?) পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা হইচই করেছেন। আন্দোলন হয়েছে; কিন্তু প্রতিকার হয়নি। অর্থাৎ, ভবিষ্যতেও বনভূমি দখল করে ইচ্ছেমতো প্রকল্প তৈরির এই কর্মকাণ্ড চলবেই। বর্তমান সরকার তাদের সময়কালে সাত কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়েছেন। গাজীপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বর্জ্যভাগাড় তৈরি সরকারি বনায়ন কর্মসূচির সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ? পাহাড় কেটে ইটভাটা তৈরি এবং তামাক চাষের যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা সরকারের বনায়ন কর্মসূচির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
দেশের মহাসড়কগুলোর দু’পাশে বনায়নের মাধ্যমে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। গাছের উপযোগিতা, উপকারিতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার বিকল্প নেই। সাথে সাথে বৃক্ষনিধন বন্ধ করা ছাড়া বৃক্ষায়ন কর্মসূচি ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



