২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের সেই নৃশংস গণহত্যার পর প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। অথচ সেই নির্মম ঘটনার অসংখ্য ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার এখনো অধরা রয়ে গেছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা ও গুরুতর জখমের অগণিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও থানাগুলো এজাহার (এফআইআর) নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করেছে। আবার কোথাও সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরাও অভিযোগ আমলে নিতে রাজি হননি। পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট- উভয়ে তাদের এ অবস্থানের পক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারার ওপর নির্ভর করছেন। মূলত ‘বেআইনি সমাবেশ’ ছত্রভঙ্গ করার দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে এ বিধান প্রণীত হয়েছিল।
১৩২ ধারার বিধান অনুযায়ী, কোনো ‘আইনবহির্ভূত সমাবেশ’ ছত্রভঙ্গ করার সময় পুলিশের দ্বারা কোনো অপরাধ সংঘটিত হলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি বিচার শুরু করতে সরকারের কাছ থেকে পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়। এ ধারার প্রয়োগ স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে একটি চরম অসঙ্গত ও আপত্তিকর ধারণার ওপর- যেখানে ধরে নেয়া হচ্ছে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার সেই জমায়েত ‘আইনবহির্ভূত সমাবেশ’ ছিল। সেই সাথে তাদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড ও নৃশংস জখম ছিল ওই ‘আইনবহির্ভূত সমাবেশ’ ছত্রভঙ্গ করার অংশ। এ ধারণার বাস্তব পরিণতি অত্যন্ত শঙ্কাজনক। এ ব্যাখ্যায় হত্যা ও গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার কার্যত সেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ওপর নির্ভর করছে, যে মন্ত্রণালয় পুলিশ বাহিনীর প্রশাসনিক অভিভাবক। এ নিবন্ধে আলোচনার বিষয় হবে- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর জখমের অভিযোগ থেকে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বাঁচাতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারাকে আইনগতভাবে আদৌ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না। একই সাথে সরল বিশ্বাসে পরিচালিত দাফতরিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যে রচিত আইনকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে অপব্যবহার করা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করা।
চব্বিশের জুলাই ও আগস্টের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারা প্রয়োগের প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো- এটি এমন একটি অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল স্রেফ একটি ‘বেআইনি সমাবেশ’। অথচ দণ্ডবিধির ১৪১ ধারা অনুযায়ী, কেবল বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাবেশ হওয়া, সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি তোলায় কোনো সমাবেশ বেআইনি হয়ে যায় না। কোনো সমাবেশকে বেআইনি বলতে হলে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, অংশগ্রহণকারীদের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল আইনে নির্ধারিত কোনো বেআইনি লক্ষ্য অর্জন করা- যেমন, আইনানুগ কার্যক্রমে বাধা দেয়া, কোনো অপরাধ সংঘটন করা অথবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্পত্তি দখল করা কিংবা কাউকে জোরপূর্বক কোনো কাজ করতে বাধ্য করা। কিন্তু জুলাইয়ের বেশির ভাগ মামলায় প্রমাণ তো দূরের কথা, এমন কোনো অভিযোগ নেই যে, ভুক্তভোগীরা এসব বেআইনি উদ্দেশ্যের কোনো একটির সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করেছিল, আজ অতীতের ঘটনায় ফিরে তাদেরই ‘বেআইনি সমাবেশের সদস্য’ কিংবা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা শুধু আইনের অপব্যাখ্যাই নয়, জাতির জন্যও গভীর লজ্জার বিষয়। যে আন্দোলনের ওপর দাঁড়িয়ে এ সরকারের জন্ম, সেই সরকারের দায়িত্ব এটা নিশ্চিত করা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারাকে আর কোনোভাবে ন্যায়বিচার ব্যাহত করার হাতিয়ার হিসেবে যেন ব্যবহার করা না হয়।
অভিযোগগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই আইনি যুক্তির কোনো শক্ত ভিত নেই। বেশির ভাগ অভিযোগ হতাহত ব্যক্তিদের স্বজনরা দায়ের করেছেন, যেখানে কেবল তাদের স্বজন কিভাবে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন, তার বিবরণ আছে। কোথাও বলা হয়নি, তারা কোনো ‘বেআইনি সমাবেশের’ সদস্য ছিলেন কিংবা তারা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করেছিলেন বা সে ধরনের কোনো উদ্দেশ্য পোষণ করেছিলেন। তাহলে কোন আইনি ভিত্তিতে একটি থানা বা আদালত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তারা বেআইনি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন? বাস্তবে যেন এমন একটি প্রবণতা গড়ে উঠেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নিচ্ছে ঘটনাটি একটি ‘বেআইনি সমাবেশ’ ছত্রভঙ্গ করার সময় ঘটেছে। অথচ অভিযোগের প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত যাচাই না করে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগপত্রে এ-সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য না থাকা সত্ত্বেও, এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া হচ্ছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে নিজের সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে, পুরো ব্যবস্থাটি যেন এখন আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
দ্বিতীয় মৌলিক সমস্যাটি হলো, আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে পুলিশ যা ইচ্ছে তাই করবে, আর ১৩২ ধারা তাদের সেই সব অপরাধ ধুয়ে মুছে দেবে- বিষয়টি মোটেই এমন নয়। এ সুরক্ষা কেবল তখন প্রযোজ্য, যখন কোনো বেআইনি সমাবেশকে আইনসম্মতভাবে ছত্রভঙ্গের উদ্দেশ্যে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কাজ করা হয়। একটি সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করতে প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসঙ্গত বলপ্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাথা বা বুকে প্রাণঘাতী অস্ত্র তাক করে গুলি চালানোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমটি সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের বৈধ উপায় হতে পারে; কিন্তু দ্বিতীয়টি নিঃসন্দেহে হত্যা, হত্যাচেষ্টা কিংবা গুরুতর জখম করার অপরাধ। জুলাই-আগস্টের বহু মামলায় অভিযোগ এই নয় যে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বলপ্রয়োগ করেছিল। বরং অভিযোগ হলো, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুক্তভোগীদের শরীরের স্পর্শকাতর অংশ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে, যাতে তাদের হত্যা করা যায় অথবা স্থায়ীভাবে গুরুতর আহত করা যায়। এমন কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবে ‘বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ’ করার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এসব ঘটনায় পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল সমাবেশ ভেঙে দেয়া নয়; বরং শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের হত্যা করা অথবা গুরুতর জখম করা। ফলে এসব ঘটনা প্রকৃতপক্ষে হত্যা, হত্যাচেষ্টা কিংবা গুরুতর জখমের অভিযোগের মধ্যে পড়ে। সে কারণে জুলাই-আগস্টের এসব ঘটনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারা প্রযোজ্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যদি যুক্তির খাতিরে ধরেও নেয়া হয়, এ ধরনের ঘটনায় সরকারের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন, তবু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়- সরকার কেন এখনো সেই অনুমোদন দিচ্ছে না, অথবা দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে না? এই সরকার যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার ভিত্তি হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অসামান্য ভূমিকা। তাই তাদের হতাহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ওপর একটি বিশেষ নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব বর্তায়। আমাদের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা প্রয়োজন- আইনানুগভাবে ‘বেআইনি জনতা’ ছত্রভঙ্গকরণের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সংঘটিত হত্যা, হত্যাচেষ্টা কিংবা মারাত্মক জখমের অভিযোগে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারার কোনো আইনি সুযোগ বিদ্যমান নেই।
পুলিশ বাহিনী সম্ভবত দাবি করবে, ১৩২ ধারা একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। এই বিধানের উদ্দেশ্য কখনো অপরাধীদের রক্ষা করা নয়; বরং দাঙ্গা, সহিংসতা বা জনঅস্থিরতার পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের এমন অভিযোগ থেকে সুরক্ষা দেয়া, যা কেবল তাদের হয়রানি করা বা দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যে করা হতে পারে। পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা না থাকলে পুলিশ কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা হরহামেশাই এমন সব ভিত্তিহীন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার মুখোমুখি হতেন, যার উদ্দেশ্য তাদের হয়রানি করা বা আইনানুগ দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া। একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন অবস্থায় ফেলা উচিত নয়, যেখানে দায়িত্ব পালনের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে তাৎক্ষণিক ফৌজদারি বিচারের ভয় যুক্ত থাকে।
আমাদের বিবেচনায়, এ প্রশ্নে চরমপন্থা নয়, বরং একটি সুষম সমাধান খুঁজে নেয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। বিচারের অনুমোদনের বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না রেখে, সেটি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হাতে অর্পণ করা যেতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থা একদিকে যেমন সৎ কর্মকর্তাদের অহেতুক হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেবে, অন্য দিকে তেমনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করবে।
তবে যেমনটা আমরা আগেই বলেছি- ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩২ ধারা মোটেও প্রযোজ্য নয়। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে এই বিধানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আজকের বাংলাদেশকে আগামী দিনগুলোতে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে হবে। হ
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



