ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ বিভাগ। গুম-অপহরণ-বিচারবহির্ভূত হত্যায় পুলিশকে ভাড়াটে বাহিনীর মতো ব্যবহার করা হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, বাহিনীটিকে গণদুশমনে পরিণত করা হয়। জুলাই বিপ্লবে তাই পুরো বাহিনীর সদস্য জনরোষের শিকার হন। ওই সময় সদর দফতর থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব থানা থেকে পুলিশ সদস্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় হিমশিম খেয়েছে। বাস্তবতা হলো— ভেঙে পড়া পুলিশের পেশাদারত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আরো সময় লাগবে। বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশকে একটি সক্ষম বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী সরকার পুলিশকে অন্যায়ভাবে ব্যবহারে অপকৌশল নিয়েছিল। যোগ্যতা দক্ষতা আমলে না নিয়ে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি-পদায়ন করে একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী তৈরি করা হয়েছিল। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটির চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় সৃষ্টি হয় বেনজীর, হারুন ও মনিরের মতো পুলিশ নামের দানব। অন্যদিকে পুলিশের ভেতর বড় একটি অংশ ছিল বঞ্চিত। এসব ক্ষত দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কল্যাণ প্যারেডে অংশ নিলে সেখানে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে কিছু বঞ্চনা আছে দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘ ৪০ বছর চাকরি করেও কোনো পদোন্নতি পান না। মামলার তদন্তে দেয়া হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। এ ছাড়া মাঠে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা নেই। মনে রাখা দরকার, জানমাল রক্ষা ও শান্তি বজায় রাখায় পুলিশি সেবার বিকল্প নেই। তাই এসব দাবি পূরণ করতে হবে সরকারকে।
বিগত সরকারের সময় গুম-খুনসহ যারা বিরোধীদের অন্যায়ভাবে দমন করত; তাদের বেছে বেছে পুরস্কার ও পদোন্নতি দেয়া হতো। দেখা গেছে, একই পুলিশ নির্ধারিত দুটো পুরস্কার পেয়েছেন। আবার বছর বছর একই ব্যক্তি এসব পুরস্কার পেতেন। দক্ষতা যোগ্যতা ও পেশাদারত্বের বিষয় একেবারে উপেক্ষিত হয়েছে। এবারো পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক ওঠায় পদক তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও পেশাদারত্ব অর্জনে এ পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ। পুরস্কারের জন্য সঠিক ব্যক্তি বাছাই করা তাই অত্যাবশ্যক।
পুলিশের চিকিৎসাসেবা উন্নতকরণ এবং সন্তানদের জন্য পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। এগুলো সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয়তার নিরিখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও প্রয়োজনীয়তা দরকার। তা যথাযথভাবে দিতে হবে। তবে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় পুলিশের সাথে সশস্ত্রবাহিনী এবং বিচার বিভাগের তুলনা সমীচীন হয় বলে আমরা মনে করি।
শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশকে পেশাদার হতে হবে। ধর্ম, বর্ণ ও দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সব নাগরিককে সমান সেবা দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পুলিশ দলের অনুগত হবে না; চলবে আইন অনুযায়ী। প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান বাস্তবে প্রতিফলন ঘটলে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আমরা একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনী পাবো।



