উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সঙ্কুুচিত হয়েছে ভোগব্যয়। সঙ্কটে আছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্পগুলো। এ অবস্থায়ও অতিরঞ্জিত তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটি চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দেখিয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর আকার দাঁড়াবে ৫০১ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থনীতির চাকা যখন প্রায় স্থবির, তখন কাগজ-কলমে বাড়িয়ে দেখানো আওয়ামী লীগের সেই উন্নয়নের গোলকধাঁধার কথা মনে করিয়ে দেয়। সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র সঙ্কটে জিডিপির এমন উপাত্ত, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে উপহাসসম।
আওয়ামী রেজিমের দেড় দশকে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের কাল্পনিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চিত্র দেখানো হতো। তখন এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ও কৃত্রিম উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে জিডিপির আকার ফুলানো-ফাঁপানো হতো। লুকানো হতো মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী রেজিমের কারসাজি খোলাসা করা হয়েছিল।
ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এই দুষ্টচক্র ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে মানুষের মনে আশা জেগেছিল একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার। অতিরঞ্জিত জিডিপির তথ্য সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। সে সময় সরকারের জরিপগুলো বাস্তবতার আলোকে তুলে ধরা হতো। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের পুরনো ভূত আবার বিবিএসের ওপর চেপে বসেছে যেন।
আইএমএফের সাম্প্রতিক ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। মান্ধাতা আমলের পদ্ধতির সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এতে প্রমাণ হয়, কাঠামোগত শুভঙ্করের ফাঁকি থেকেই গেছে। বাস্তবতা হলো, এখন যদি জিডিপির কৃত্রিম হিসাব সংশোধন করা হয় তাহলে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এতে ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা ধসে পড়বে, মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে দাতা সংস্থাগুলো।
একটি দেশের টেকসই অর্থনীতির মেরুদণ্ড তার শিল্প খাত। এ খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ বিবিএস কৃষি ও সেবা খাতের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দাবি করছে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নেমে গেছে। তৈরী পোশাকসহ সামগ্রিক রফতানি আয় কমছে। শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় লাটে উঠছে ব্যবসা। এমন একটি ধীরগতির অর্থনীতিতে মাথাপিছু গড় আয় তিন হাজার ২০ ডলারে উন্নীত হওয়ার দাবিকে প্রশ্ন না করে উপায় আছে কী।
আওয়ামী দুঃশাসন অর্থনীতিকে ধ্বংসের দরজায় নিয়ে গিয়েছিল। সাময়িক সুবিধা বা বিদেশী ঋণের পথ খোলা রাখতে গিয়ে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে আত্মঘাতী নীতি নেয়া হয়েছিল। ওই নীতি দেশকে দীর্ঘমেয়াদি দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এখনো যদি একই পথে হাঁটা হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির সাথে তামাশা করার শামিল।
আমরা মনে করি, জাতীয় হিসাব পদ্ধতির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। পদ্ধতিগত সংস্কার করে জিডিপির প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা হোক। কাগজের জিডিপি বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এতে অর্থনীতির জন্য তৈরি হয় কৃষ্ণ গহ্বর।



