সরকারি হেফাজতে থাকা নারীর লাশে অবমাননাকর কিছু ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। নারীর লাশের ওপর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় তদন্তে এর সাথে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে লাশঘরে কিংবা লাশ বহনের সুযোগে বিকৃত যৌনবাসনা চরিতার্থের আলামত পাওয়া গেছে। দেশের প্রচলিত আইনে জঘন্য এই অপরাধের কোনো উল্লেখ না থাকায় অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিকৃত যৌনাচার প্রতিরোধে ‘নারী ডোম’ নিয়োগ প্রসঙ্গে রুল দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
নারীলাশের গোপনীয়তা ও মরণোত্তর মর্যাদা রক্ষা এবং ধর্মীয় বিধান বজায় রেখে ময়নাতদন্ত করার বিষয়ে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মর্গে নারীর লাশের ময়নাতদন্তে নারী কর্মী বা ‘নারী ডোম’ নিয়োগের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না; তা জানতে চেয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে। রিট আবেদনটিতে বলা হয়, ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী নারীর লাশ সতর বা পর্দার অন্তরালে রাখা আবশ্যক। নারীর লাশে পরপুরুষের স্পর্শ বা উপস্থিতি কাম্য নয়। নারীর লাশকে অবমাননার হাত থেকে হেফাজত ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় তাই নারী ডোমের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে আরো আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল।
নারীর লাশে বিকৃত যৌনাচারের কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা এক তরুণীর লাশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। লাশ বহনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে এমন আরেকটি ঘটনায় মর্গের পাহাদার এক ব্যক্তি আটক হয়। ২০২০ সালে ঢাকা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঁচটি নারীর লাশে একই ব্যক্তির বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এর জন্য অভিযুক্ত হয় মর্গের ডোমের এক সহযোগী। নারীর লাশের প্রতি বিকৃত যৌনাচারের কতগুলো ঘটনা ঘটছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, কিছু বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি এমন জঘন্য ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে নারীর লাশ তদন্ত ও কাটাছেঁড়ায় নারী ডোম নিয়োগের দাবিটি যথার্থ।
নারীর লাশের প্রতি যৌন অনাচার করলে তার বিচারে আইনের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধি ২৯৭ ও ৩৭৭ ধারায় পরোক্ষভাবে এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যায়। যেখানে জোরপূর্বক যৌনাচার ও উপাসনালয়ে বা সমাধিস্থলে প্রবেশ করে লাশের প্রতি অসম্মানজনক আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই আইনে নারীর লাশের অবমাননার বিচারের সুনির্দিষ্ট বিধি নেই। ফলে মর্গ বা হাসপাতালে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
লাশের সাথে যৌনকামনা চরিতার্থ করা এক ভয়াবহ বিকৃতি ও অপরাধ। মনুষ্যসমাজে প্রাচীনকাল থেকে এই অপরাধপ্রবণতা ছিল। আইন ও অনুশাসনে একে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন যেমন দরকার, পাশপাশি লাশের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমলে নিতে হবে। নারীর লাশ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদন্তে নারীদের দায়িত্ব দেয়াই অধিকতর মানবিক ও যুক্তিযুক্ত।



