সরকারি পরিকল্পনায় মানবাধিকার লঙ্ঘন নেই, রাষ্ট্র স্থিতিশীল হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে

গণ-অভ্যুত্থানের পর বড় শঙ্কা ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকার মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও মানুষের অধিকার হরণ করে সারা দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি কায়েম করা হয়েছিল। হাসিনার পতনের পর অত্যাচারিত মানুষ আইন হাতে তুলে নিয়ে ফ্যাসিস্ট ও তার দোসরদের ওপর পাল্টা চড়াও হওয়া ছিল স্বাভাবিক। সে কারণে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিনিয়ত শঙ্কা করা হতো— দলটি ক্ষমতাচ্যুত হলে তাদের লাখ লাখ নেতাকর্মী-সমর্থক হত্যার শিকার হবে। বিগত ১৭ মাসে অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার চিত্র দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশে তেমন কিছু ঘটেনি।

সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণে প্রতিশোধের রাজনীতি দেশে এ সময়ে চর্চিত হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা শূন্যে নেমে এসেছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। এর মূল কারণ সঠিক সময়ে বিচার না পাওয়া। ফ্যাসিবাদী জমানায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে বড় আকারে সংস্কার করতে না পারায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমের বড় একটা অংশ এটিকে মব-সন্ত্রাস হিসেবে ফ্রেমিংয়ের অপচেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে পুরনো ভুক্তভোগীদের নাম যেমন নিচ্ছে না, একইভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পুরনো স্বভাবের বিষয়টিও উল্লেখ করছে না।

আরেকটি বড় কারণ, দখল ও চাঁদাবাজি। আগে যেসব জায়গা আওয়ামী চক্রের দখলে ছিল এবং যেসব খাত থেকে চাঁদা তুলত; সেগুলোতে নতুন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রক্তপাত ও খুনোখুনি হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় দলের দায় একচেটিয়া। মূলত দলটির নিজেদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলে হতাহতের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই পর্যন্ত এক হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীর সঙ্ঘাতে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। এর কেন্দ্রে ছিল চাঁদবাজি, দখলবাণিজ্য ও আধিপত্য বিস্তার।

গণপিটুনির ঘটনায় এ সময়ে ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হওয়ার কথা সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। এর পেছনে মূলত ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরনো প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কার করে যদি কার্যকর বাহিনী হিসেবে দাঁড় করাতে পারত; তাহলে গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি হত না। ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের দুর্বল ও নমনীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে গড়ে ওঠা কিছু নব্য সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষ অথবা হেফাজতে থাকা অবস্থায় ৬০ জনের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখযোগ্য কমে যেত।

দেশে মানবাধিকার পরিস্থতির নিংসন্দেহে উন্নতি হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটত, সেগুলো শূন্যে নেমে এসেছে। এখন দরকার আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাজনিত মানবাধিকার পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরা। এ জন্য প্রথমত প্রয়োজন স্বচ্ছ ও গতিশীল বিচার বিভাগ। কিছু ক্ষেত্রে এর উন্নতি হলেও এখনো সন্তোষজনক নয়। একই সাথে দরকার আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে পেশাদার করে গড়ে তোলা। কাজটি নতুন সরকারকে করতে হবে।