মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। কোনো যুগান্তকারী ঘটনা ঘটাননি তিনি। বরং নিজ দলের অঙ্গীকারের বিপরীতে দুর্নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আলোড়ন তুলেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেন। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এই অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠনের দু’দিন না যেতেই সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা পেল জাতি। মন্ত্রী বললেন, সমঝোতার ভিত্তিতে টাকার লেনদেন হলে তা চাঁদা নয়।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, নবগঠিত সরকার মন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদার জাতীয়করণের ঘোষণা দিলো কিনা। এ প্রশ্ন প্রতিটি দেশবাসীর। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মন্তব্য করেছে, পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য ঘোরতর অপরাধকে বৈধতা দেয়ার অজুহাত।
দেশবাসী দেখেছেন, ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ কেউ তোলেনি। জীবনের ভয় ছিল। এখন নতুন মন্ত্রীর সংজ্ঞা অনুযায়ী ধরে নেয়া যায়, সবাই সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন করেছে। কাজেই ওটা চাঁদা নয়।
মন্ত্রীর বক্তব্যে জনগণের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বের কাছে নতুন সরকারের যে ভাবমর্যাদা তৈরি হলো তা আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সবাই ধরে নেবে, নতুন সরকার দুর্নীতির উচ্ছেদ নয়, লালন-পালন করেই দেশ চালাবে। যেমনটা আওয়ামী সরকার চালিয়েছে। এ শুধু সরকার বা সরকারি দলের জন্য নয়, গোটা দেশ ও জাতির জন্য হবে মর্মপীড়ার কারণ।
একটি বিষয় কাকতালীয়ভাবে আওয়ামী সরকারের সাথে মিলে গেছে। ২০১২ সালে তখনকার সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও একই অজুহাতে চাঁদাবাজি বৈধ করার চেষ্টা করেছিলেন। নবগঠিত বিএনপি সরকারেরও সড়ক পরিবহনমন্ত্রীও সেই চেষ্টাই যেন করলেন।
সবাই জানেন, বাংলাদেশে চাঁদাবাজির এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত চাঁদাবাজির বৃহত্তম খাত। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে একটি গাড়ি যেতে অন্তত ১০ জায়গায় চাঁদা আদায় করা হয়। এমন চাঁদাবাজি দেশের সব সড়ক, মহাসড়কেই হয়। শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় দুই কোটি টাকার বেশি। ভাগ যায়, মালিক, শ্রমিক, রাজনীতিক, সমাজপতি, পুলিশসহ নানা জায়গায়।
চাঁদাবাজি করে মূলত পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল। ৫ আগস্টের গণবিপ্লবের পর চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। শুধু নতুন লোক এসেছে। গত দেড় বছর ধরেই নতুন লোকেরা চাঁদা তুলছে। এখন নতুন সরকারের মন্ত্রী যেভাবে এর বৈধতা দেয়ার সুপারিশ করছেন তাতে জনগণ হতবাক।
একটি গুরুতর অপরাধকে যারা বৈধতা দিতে চায় তারা কিভাবে দুর্নীতি রোধ করবে? বিএনপি শুধু ভোট পাওয়ার জন্য দুর্নীতি রোধের কথা বলেছে কি না এমন প্রশ্ন উঠছে। বলা হচ্ছে, দলটির বক্তব্য যদি নিছক ফাঁকা বুলি না হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ঘোষণা দিয়ে পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান এবং মন্ত্রীর জবাবদিহির ব্যবস্থা করা দরকার।
দেশবাসী আশা করে, আগামী দিনে নতুন সরকারের আর কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড জনমনে ফ্যাসিবাদী সরকারের স্মৃতি জাগিয়ে তুলবে না।



