ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় স্থবিরতা

বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মপরিবেশের অভাব

মানসম্পন্ন গবেষণা বাড়াতে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্যোগী হতে হবে; তেমনি প্রয়োজনীয় অর্থ সহযোগিতা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকার-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে একটি কাক্সিক্ষত বিশ্বমানের গবেষণাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ এবং জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানো। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান বিতরণের কাজ কোনো রকম চালিয়ে গেলেও বাকি দু’টি কর্তব্য সম্পাদনে অনেক পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাবিমুখতা। দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি বেশি গবেষণা হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুপস্থিত। বাস্তবে ঢাবিতে গবেষণায় স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দেয়া সরকারের গবেষণা তহবিল আবার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এই অবস্থা হয় তা হলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার কেমন পরিবেশ রয়েছে, তা সহজে অনুমেয়।

নয়া দিগন্তে গত রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গবেষণা খাতে ২০ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় না হওয়ায় তা সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে। গত পাঁচ বছরে গবেষণা খাতে ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ফলে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার প্রতি শিক্ষকদের এই যে অনাগ্রহ, এর অন্যতম কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়া। একটি মানসম্মত গবেষণা সম্পন্ন করতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তা দেয়া হয় না। এ ছাড়াও সমাজে একজন গবেষককে যে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া প্রয়োজন তার কিয়দংশও পান না তারা। একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হলেও এই বিদ্যাপীঠে যে গবেষণা হয়নি তা নয়। আন্তর্জাতিক ডেটাবেস স্কোপাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও এসব গবেষণার মান, মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে যখন কোনো শিক্ষকের গবেষণাকর্মে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে এবং প্রমাণিতও হয়।

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতি, অগ্রগতিসহ সঙ্কটকালে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেয় সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়। গোটা পৃথিবীতে তাই হচ্ছে। কয়েক বছর আগে পৃথিবীর মানুষ যখন করোনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল; ঠিক তখনই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় করোনা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে বিশ্ববাসীকে অতিমারী নিয়ন্ত্রণে আশ্বস্ত করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর পেছনে ছিল নিরলস গবেষণা ও বিপুল অর্থবিনিয়োগ। আমাদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বটে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনে যে ভূমিকা রাখার আবশ্যকতা ছিল তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় পূরণ করতে পারছে না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সবাই একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছেন। যেখানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হবে বিশ্বমানের। এ জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন; তা না দিলে কাক্সিক্ষত মানের বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া সম্ভব নয়।

মানসম্পন্ন গবেষণা বাড়াতে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্যোগী হতে হবে; তেমনি প্রয়োজনীয় অর্থ সহযোগিতা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকার-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে একটি কাক্সিক্ষত বিশ্বমানের গবেষণাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।