বিশ্ব এখন এক অদৃশ্য সঙ্কটের মুখোমুখি। ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার মতো দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর স্বাভাবিক আচরণের পরিবর্তন ঘটছে। এর বিপুল বৈশ্বিক প্রভাবের কারণ উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া। আমাদের দেশেও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল যেন দীর্ঘ ও তীব্র হয়ে উঠছে, এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শ্রমজীবী, শিশু ও বয়স্করা।
নয়া দিগন্তের খবর, বিগত বছরের মতো এবারো রেকর্ড তাপমাত্রা হতে পারে। দেশে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে এপ্রিলে। এর গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ মাস। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে তা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা এবারো রেকর্ড হতে পারে।
সাম্প্রতিক বেসরকারি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সামনের চার বছরের মধ্যে ৪৫ ডিগ্রি এবং ২৫ বছরে গরমের মাত্রা ৪৬ ডিগ্রি ছাড়াবে। ৩৪ সালের দিকে আরেকটি চরম তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রিকর্ড ছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত চার যুগে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গবেষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই গড় তাপমাত্রা আরো দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে বিগত সময়ের রেকর্ড ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। ঋতুচক্রের অস্বাভাবিকতা, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রাণবৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষয় দেখা যাচ্ছে। মানুষের রোগ-বালাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। মশার বংশবৃদ্ধির সাথে তাপমাত্রার পরিবর্তনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব আগের চেয়ে বেড়েছে। উল্লিখিত সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। সেই ধারা এখনো দেখা যাচ্ছে। গরম বেড়ে যাওয়ায় হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্ট রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং অতিরিক্ত তাপদাহ ফসল উৎপাদন ব্যাহত করছে। খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ছে। একই সাথে পানির সঙ্কটও প্রকট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আরো বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বন উজাড় বন্ধ করা এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করা— এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, জনসচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়; এটি আমাদের বর্তমানের সঙ্কট। আমরা যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।



