প্রায় ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্নির্মাণের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছে। বিভিন্ন অঙ্গ ও বিভাগের সংস্কারে গঠিত কমিশনের বিস্তারিত প্রতিবেদনের আলোকে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেছে। বেশ কয়েক মাস ধরে টানা বিষয় ধরে ধরে ওই সব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বহু বিষয়ে সংস্কারে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এমন ৮৪টি বিষয়ে সংস্কার কার্যকর হয়েছে। কিছু গুরুতর বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় উদ্বেগও রয়েছে। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তার বক্তব্যে অসীম সম্ভাবনার সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়; সেই তাগিদ দিয়েছেন। দেশ ও জাতির স্বার্থে সবাইকে এক জায়গায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জাতির সামনে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। তিনি একে আলাদিনের প্রদীপের সাথে তুলনা করেন। যেখান থেকে সেই উপকারী দৈত্যের আবির্ভাব হয়েছে। সে পারে অসাধ্য সব কাজ সাধন করতে। জুলাই বিপ্লবে একসাগর রক্তের মধ্য দিয়ে এই সুবিধাজনক পরিস্থিতির আগমন ঘটেছে। একে সঠিক মূল্যায়ন করলে রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে। ঐকমত্য কমিশন ইতোমধ্যে বিপুল কাজ করেছে। তাদের এ কাজ কোনো বইপুস্তক থেকে ধার করে হয়নি। অংশীজনের সাথে বিপুল মতামত গ্রহণ করে করা হয়েছে। জনগণের সব অংশের প্রতিনিধি ও সুশীলসমাজ এতে অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এ পথ তৈরি হয়েছে। সংস্কার প্রশ্নে হাজার হাজার মানুষ মতামত দিয়েছেন। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এত মানুষের মতামত দিয়ে অংশগ্রহণ বিশ্বে বিরল। সে কারণে অন্যান্য দেশের জন্য এ বিশাল কর্মযজ্ঞ একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনায় হোঁচট খাওয়া দেশগুলো আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারবে, এমন আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, ‘আমরা হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেছি, এখন শুধু সঠিক সাইনবোর্ড বসানো বাকি’। তিনি বলেন, ‘আমাদের গন্তব্য পরিষ্কার- একটি ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। এ যাত্রাপথে যেন কোনো খুঁত না থাকে, সেটিই আমাদের সবার দায়িত্ব।’ তিনি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জোর নিশ্চয়তা দেন। এর মাধ্যমে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিচক্ষণতা ও দেশপ্রেমের ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ভর করছে। তারা যদি সামান্য স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে কিংবা অপরিপক্বতার পরিচয় দেন; তাহলে জেগে ওঠা সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। দলগুলো বলে থাকে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখন সেটি প্রমাণের সময় এসেছে। নিজেদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ আপাতত সরিয়ে রেখে হলেও সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও রাজনৈতিক দলগুলো সবাই এক জায়গায় আসতে পারেনি। কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে হবে। দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম একটি সমঝোতায় আসার পথ কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে। জুলাইয়ে রক্তদান বৃথা যাবে না। আশা করা যায়, বাংলাদেশ তার গন্তব্যে পৌঁছাবে।



