রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আলাপ নেই

সাহায্য কমায় সঙ্কট বাড়ছে শিবিরে

পরিস্থিতির আরো অবনতি ঠেকাতে হলে ঢাকার উচিত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। এ জন্য মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনও কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে নেয়াই এর একমাত্র সমাধান। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক সব কর্মকাণ্ড ঢাকাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

বিশ্বে রোহিঙ্গারা সবচেয়ে পীড়িত জাতিগুলোর একটি। তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্র বৌদ্ধধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিকার পায়নি। এদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশও যেন ক্রমাগত তাদের বিপদ বাড়াচ্ছে। সাহায্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ধীরে ধীরে এমন মানবিক সঙ্কটের কথা ভুলতে বসেছে। ইতোমধ্যে তাদের জন্য সাহায্য কমে অর্ধেকে নেমে গেছে। এতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য চিকিৎসা বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদায় ঘাটতি বাড়ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশের ওপর এ নিয়ে আর্থসামাজিক চাপ বাড়ছে। দ্রুত বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা না গেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট আরো গুরুতর রূপ নেবে। বাংলাদেশে প্রবেশে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল নামে ২০১৭ সালে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে তখন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া হয়।

বিশ্বব্যাংক, এডিবি, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বৈশ্বিক দাতা সংস্থাগুলোর সাহায্যে আশ্রয়শিবির পরিচালিত হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে এক বিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক সাহায্য এসেছে। সবচেয়ে বেশি সাহায্য দানকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদলে ট্রাম্প প্রশাসন অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। একই ধরনের প্রবণতা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য দাতাসংস্থাগুলোও অনুসরণ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রোহিঙ্গা শিবিরে জনপ্রতি বরাদ্দে। এ কারণে পুষ্টিঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেই সাথে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা সঙ্কুুচিত হচ্ছে।

পাহাড়ের ঢালে বানানো শিবিরের ভূমিধস রোদ ও আশ্রয়কেন্দ্র মেরামত করা যাচ্ছে না। এতে করে রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে হতাশা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ক্যাম্পে অস্থিরতা উত্তেজনা বাড়ছে। সেখানে নিয়মিত খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। এর সুযোগ নিচ্ছে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান চক্র। মানবপাচারের ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি এ ধরনের একটি ঘটনায় মালয়েশিয়ায় যেতে গিয়ে শতাধিক রোহিঙ্গার প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গুরুতর ব্যাপার হচ্ছে, কক্সবাজার অঞ্চলে সন্ত্রাস ও আধিপত্য বিস্তারে রোহিঙ্গা তরুণদের ব্যবহার। উচ্চহারে বেআইনি কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণে স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর চাপ বাড়ছে। এমনকি স্থানীয়দের সুযোগ সুবিধা কমছে। ইতোমধ্যে সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে প্রাণ-পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের কূটনীতি ঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়নি। এ সঙ্কটের পুরো সময়জুড়ে ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতায় ছিল। তারা সঙ্কট সমাধানের চেয়ে নিজেদের সুবিধা কিভাবে আসবে তা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বাইরের শক্তির ইন্ধনে তারা পরিচালিত হয়েছে। সেজন্য রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর কখনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা যায়নি।

রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সামরিক কর্তাব্যক্তিরা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা। এর কিছু হয়নি। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে ছিল ক্ষীণকণ্ঠ। এ দুর্বলতায় বিশ্বসম্প্রদায়ও ধীরে ধীরে এ সঙ্কট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

পরিস্থিতির আরো অবনতি ঠেকাতে হলে ঢাকার উচিত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। এ জন্য মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনও কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে নেয়াই এর একমাত্র সমাধান। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক সব কর্মকাণ্ড ঢাকাকে ঢেলে সাজাতে হবে।