প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর

দেশের স্বার্থ রক্ষা প্রধান বিবেচ্য

নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘সরকারপ্রধান কোন দেশ সফর করবেন তা জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। আমরা কোথায় যাবো সেটি অন্য কেউ নির্ধারণ করবে না। কারণ আমরা বৈধ সরকার, জনগণের রায়ে নির্বাচিত। আমরা এখন শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলতে পারি, দরকষাকষি করতে পারি।’ সরকারের এ অবস্থান স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের স্পষ্ট বার্তা। এখন কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ দেয়ার পালা।

দেড় যুগ বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। ক্রমে তা প্রতিবেশী দেশের প্রতি নতজানু হয়ে কোণঠাসা হয়ে যায়। দেশের স্বার্থ অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ গিয়ে প্রতিবেশীর চাওয়া প্রধান হয়ে ওঠে। এ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে প্রবল বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া। সেখান থেকে চার দিনের চীন সফর করবেন তিনি। এতদিনকার একমুখী সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে নতুন পররাষ্ট্র সম্পর্ক গঠনের বার্তা দিচ্ছে বিএনপি।

ফ্যাসিবাদের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও নড়বড়ে অর্থনীতি। একমুখী নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এ জন্য মোটাদাগে দায়ী। গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠন তাই জরুরি। তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর চিন্তাভাবনা করে নেয়া হয়েছে। নতুন সরকার সব ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ এই নীতি নিয়েছে। দেশের স্বার্থে বাইরের দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদ ঘোষণা করা হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।

এই সফরে জনশক্তি রফতানি নিয়ে জটিলতার অবসান করা লক্ষ্য। একটি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির নিয়ন্ত্রত নিয়ে হাজারো মানুষের পকেট কেটেছে। একপর্যায়ে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের লক্ষ্য দেশটির জনশক্তি রফতানি চালু এবং এ প্রক্রিয়াকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা।

চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, আঞ্চলিক রাজনীতি ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা এর লক্ষ্য। সফরে ১৩টি সমঝোতাস্মারক, দু’টি চুক্তি, একটি করে পরিকল্পনা ও প্রটোকল সই হতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশটির সহায়তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের বড় পরিসরে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য ভারতের মোকাবেলা সহজ করবে। এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়। বাস্তবে, ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সমমাত্রার সম্পর্কের ধার ধারে না। দিল্লি শুধু বড় ভাইসুলভ আচরণে অভ্যস্ত। এ অবস্থায় নমনীয়তা দেখিয়ে ভারত থেকে কিছু আদায়ের চিন্তা করা ভুল; বরং বড় শক্তিগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়লে ভারতের আগ্রাসন মোকাবেলার কৌশল টেকসই হবে। সে জন্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সাথে সমর্থন জানিয়ে অগ্রসর হওয়া আমাদের উত্তম কৌশল।

ইতোমধ্যে বেইজিং বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। তারেক রহমানের সফর উপলক্ষে চীন একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করেছে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিনিয়োগে কী কী সুবিধা আছে তা তুলে ধরা হবে। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথেও একান্ত বৈঠকে মিলিত হবেন। সফরটি চীন গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। এ সুযোগ আমাদের নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে।

নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘সরকারপ্রধান কোন দেশ সফর করবেন তা জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। আমরা কোথায় যাবো সেটি অন্য কেউ নির্ধারণ করবে না। কারণ আমরা বৈধ সরকার, জনগণের রায়ে নির্বাচিত। আমরা এখন শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলতে পারি, দরকষাকষি করতে পারি।’ সরকারের এ অবস্থান স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের স্পষ্ট বার্তা। এখন কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ দেয়ার পালা।