রাজধানীর গণপরিবহনে যে শৃঙ্খলা ফিরেনি, এর প্রমাণ মেলে মাঝে মধ্যে। ঢাকায় যাত্রীবাহী বাসগুলো এমন বেপরোয়া চলে, যাতে প্রাণ যাচ্ছে যাত্রীর। এমন একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এখনো নগরবাসীর স্মৃতিতে গভীর ক্ষত রেখে গেছে। দুর্ঘটনাটি তখন সারা দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল দুই বাসের রেষারেষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজীবের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। ঘটনাটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। জড়িতদের ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন আদালত।
ওই বছর দুই কলেজশিক্ষার্থী রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত হলে সারা দেশ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। এরপর আইনে বদল এনেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। এ ক্ষেত্রে ঢাকার গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা নিত্যদিনের ঘটনা। প্রায়ই বাসচালকদের বেপরোয়া যানবাহন চালনায় আহত-নিহতের ঘটনা ঘটছে।
গণমাধ্যমের খবর, রাজধানীর চানখাঁরপুলে গত বুধবার বিকেলে মৌমিতা পরিবহনের একটি বাসে ওঠার চেষ্টা করছিলেন জয়দেব নামের এক যাত্রী। এ সময় বাসটি চলতে শুরু করলে পাশেই একই পরিবহনের আরেকটি বাস পাল্লা দিতে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে দুই বাসের মাঝখানে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নগরজীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন গণপরিবহন। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে বাসসহ বিভিন্ন গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করেন। যাত্রীসেবার এই মাধ্যম আজ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। রাস্তায় চলছে যানবাহনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় চালকরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বেশি যাত্রী উঠাতে বেপরোয় হয়ে ওঠেন। এক বাস আরেক বাসকে পেছনে ফেলার জন্য পাল্লা দেয়। নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা করে, অতিরিক্ত গতি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করে। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
চালকদের দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ জমা দিতে হয়। এ কারণে যাত্রী নেয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন। নিরাপত্তার চেয়ে তখন আয়ই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য। সড়ক আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা না থাকায় এমনটি ঘটতে পারছে। দুর্ঘটনার জন্য দোষী চালক বিচারের আওতায় অসে না। অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, স্বল্প মজুরিও সড়কে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানি ঘটাচ্ছে না, অসংখ্য পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত হলে তার পরিবারের ওপর নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা।
আহতদের অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। অথচ এসব দুর্ঘটনার বড় অংশ সচেতনতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, চুক্তিভিত্তিক মজুরি পদ্ধতির পরিবর্তে স্থায়ী বেতনব্যবস্থা চালু করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং সড়কে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা জরুরি। সেই সাথে যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবেই আশা করা যায়, যাত্রী ভোগান্তি কমার। একই সাথে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসার।



