দেশের ৭৪ কারাগারে তিন শতাধিক শিশু তাদের মায়েদের সাথে অবরুদ্ধ জীবন পার করছে বলে তথ্য উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। এই তথ্য উদ্বেগজনক। গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশ হওয়া খবর থেকে জানা গেছে, কারাগারে মায়ের সাথে থাকা শিশুদের সংখ্যা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেয়া হয়। এটি আমাদের বিচারিক ব্যবস্থার মানবিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
মায়েদের বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থার কারণে তাদের সন্তানদেরও কারাগারে থাকতে হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী নিরাপত্তা, শিক্ষা ও বাসযোগ্য পরিবেশ পাওয়ার অধিকার আছে প্রতিটি শিশুর। কারাগারে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এসব মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হচ্ছে।
আমাদের দেশের কারাগারগুলোর অবস্থা নাজুক। কারাগারের ভেতরে মাদক সেবন করা দীর্ঘদিনের সঙ্কট। অনেক অপরাধী কারাগারে ঢোকেন মাদকমুক্ত থেকে। কিন্তু বের হয়ে আসেন মাদককে অভ্যাসের সঙ্গী করে। এমন পরিস্থিতিতে কারাগার শিশুদের জন্য আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া এর ভেতরে বিভিন্ন অপরাধীর সান্নিধ্যে থেকে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট হওয়া স্বাভাবিক। দীর্ঘমেয়াদি এসব নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য।
উন্নত দেশে কারাবন্দী মা ও শিশুদের জন্য আলাদা ‘মাদার অ্যান্ড বেবি ইউনিট’-এর ব্যবস্থা থাকে। এই ইউনিটে কারাগারের কঠোর পরিবেশ থাকে না। নিশ্চিত করা হয় শিশুবান্ধব পরিবেশ। যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে কারাগারের ভেতরেই শিশুদের জন্য থাকে আলাদা নার্সারি, খেলার মাঠ। থাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন ও তীব্রতা বিবেচনা করে মায়েদের জন্য ‘ওপেন প্রিজন’ বা উন্মুক্ত কারাগারের সুযোগ রাখা হয়। খেয়াল রাখা হয়, শিশুরা যেন সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। অনেক দেশে শিশুদের নির্দিষ্ট বয়স হওয়ার পরও যদি মাকে কারামুক্ত করা সম্ভব না হয়, তখন বিকল্প যত্নের মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা হয়। আমাদের দেশেও শিশুদের জন্য এই জাতীয় বিশেষায়িত পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কারাগারে থাকা শিশুদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে। কারাগারে শিশুদের থাকার স্থান সাধারণ বন্দীদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং শিশুবান্ধব করা জরুরি। তাদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, সুষম খাবার এবং নিয়মিত বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব নারী লঘু অপরাধে অভিযুক্ত অথবা যাদের সন্তান ছোট, তাদের ক্ষেত্রে জামিনপ্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে। অথবা গৃহবন্দী রাখা বা কমিউনিটি সার্ভিসের ব্যবস্থার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে না রেখে, সমাজের সেবামূলক কাজ আদায় করে শাস্তি ও সংশোধন নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে শিশুদের জন্য স্থায়ী মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। আমরা আশা করি আদালতের এই নির্দেশনা কেবল কাগুজে প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারাবন্দী শিশুদের ‘বিপন্ন শৈশব’ উদ্ধারে কার্যকর রোডম্যাপ করা হবে। মায়ের অপরাধের দায়ে যেন কোনোভাবেই শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়া না হয়। মুক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠার অধিকার প্রতিটি শিশুর জন্মগত। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।



