পাহাড়ধসে প্রাণহানি প্রাকৃতিক নয়

অব্যবস্থাপনার করুণ পরিণতি

উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করলে তার মূল্য একসময় জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। তাই টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমানোর কর্মসূচি নিতে হবে। মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত পারে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। তবে এই মুহূর্তে দরকার, ভারী বর্ষণের এই সময়ে কালক্ষেপণ না করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া।

বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ধসের খবর যেন আমাদের জন্য এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান অনেক মানুষ। স্বজন হারানোর আহাজারি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং জীবিকার ক্ষতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এসব মৃত্যুর বেশির ভাগ এড়ানো সম্ভব। এটি প্রতিরোধযোগ্য। তাই পাহাড়ধসকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পরিকল্পনার অভাব, পরিবেশ ধ্বংস এবং দায়িত্বহীনতার বিষফল।

প্রতি বছরের মতো এবারো মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। গত বৃহস্পতিবার পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৯ জন হয়েছে। সর্বশেষ বান্দরবান ও কক্সবাজারে পাহাড়ধসে দুই পরিবারের পাঁচজনসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনই শিশু। এর আগে গত রোববার রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আটজন, জেলা সদরে একজন, পেকুয়ায় একজনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটিতে মঙ্গলবার পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় মৃত্যু হয় পাঁচজনের। কক্সবাজারে গত বুধবার পাঁচজন ও চট্টগ্রামে দুই শিশু নিহত হয়। স্মরণযোগ্য যে, চট্টগ্রামেই ১৯ বছরে পাহাড়ধসে ২১৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

পাহাড় ভূপৃষ্ঠের ভারসাম্য রক্ষা করে থাকে; কিন্তু আমরা অবিবেচকের মতো সেই পাহাড় নির্বিচারে ধ্বংস করে চলেছি। ফলে পাহাড়ধসে প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাহাড়ধসের অন্যতম প্রধান কারণ হলোÑ নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন। পাহাড়ের গাছপালা মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে; কিন্তু যখন বন ধ্বংস করে পাহাড় কেটে বসতি, সড়ক বা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, তখন পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর সাথে টানা ভারী বৃষ্টি যুক্ত হলে মাটি আলগা হয়ে ভয়াবহ ধসের সৃষ্টি হয়। দারিদ্র্য ও নিরাপদ আবাসনের অভাবে অনেক মানুষ ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ের পাদদেশে নিরুপায় হয়ে বসবাস করেন।

পাহাড়ধস রোধে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা এবং বন উজাড় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শুধু উচ্ছেদ নয়Ñ তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে, যাতে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস পেলে দ্রুত মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়। পাশাপাশি পাহাড়ে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।

উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করলে তার মূল্য একসময় জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। তাই টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমানোর কর্মসূচি নিতে হবে। মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত পারে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। তবে এই মুহূর্তে দরকার, ভারী বর্ষণের এই সময়ে কালক্ষেপণ না করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া।