স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ খুব কম সময় বাইরের শক্তির প্রভাবমুক্ত পরিবেশে এগোতে পেরেছে। চব্বিশের রাজনৈকিতক পটপরির্তনের পর প্রথম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সুযোগ পায় বাংলাদেশ। আশা করা গিয়েছিল ভারত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট দলের পরিবর্তে বাংলাদেশের জনগণের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। সেভাবে দিল্লি বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করবে; কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু বাহ্যিক নমুনা দেখালেও বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সেই সদিচ্ছায় ভাটা পড়েছে। বরং ফের বাংলাদেশকে চাপে রাখার নীতি নিয়েছে দেশটি। পুশইনের নামে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এমন নিরাপত্তাহুমকি সৃষ্টি করছে, যা সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুতর বাধা হতে পারে।
সম্প্রতি দিল্লিতে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজারের বক্তব্য এই প্রেক্ষাপটে বিচার্য। গত বুধবার ভারতীয় গণমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে দিল্লিতে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস সক্রিয়। দুই দেশে হামাসের কার্যক্রম ইসরাইল পর্যবেক্ষণ করছে। হামাসকে একটি উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেননি; কিন্তু এ নিয়ে ভারতের গণমাধ্যম জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। তাতে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশেরও কিছু গণমাধ্যম।
একটি জাতীয় দৈনিকের এ-সংক্রান্ত রিপোর্টে গতকাল বলা হয়, ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতের সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের উৎস হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদী থিংক ট্যাংক উসানাস ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে গত ১২ মে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ। ওই নিবন্ধের সূত্রে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত এমন ভিত্তিহীন বক্তব্য দেন। স্পষ্টত এটি বাংলাদেশ ও এর নির্বাচিত সরকারকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে হেয় করার পরিকল্পিত অপচেষ্টা। এটি এমন সময়ে ঘটল যখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বিপুলভাবে বেড়েছে। একটি গরিব ও সঙ্কটাপন্ন দেশের পরিচয় মুছে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। এটি সম্ভব হলে বাংলাদেশ রাজনীতি, অর্থনীতি সব দিক থেকে পরনির্ভরতা মুক্ত হবে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সফল হলে ভারতের আধিপত্য খর্ব হবে। এখানেই ভারতের সমস্যা। বাংলাদেশের ওপর অব্যাহত চাপ বাড়ানোর ভারতীয় নীতির এটিই ব্যাখ্যা। কিন্তু এর ফল বাস্তবে ভিন্ন হতে পারে। পাকিস্তানকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে ভারত এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হওয়ার উপক্রম। সম্প্রতি জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে ভারতীয় নেতার প্রতি বিশ্বনেতাদের উপেক্ষার দৃশ্য বিশ্লবাসীর নজর এড়ায়নি। ভারতের জন্য এটিই বাস্তবতা।
৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নির্বিচার নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও বর্জনের মুখে ইরানের অবিশ্বাস্য উত্থান দেখিয়েছে, জনগণ ঐক্যবদ্ধ ও নেতৃত্ব সুদৃঢ় অবস্থান নিলে কোনো দেশকে মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশ সামরিক শক্তিতে দুর্বল হতে পারে; কিন্তু জনবলে নয়। নির্বাচিত সরকার সবাইকে সাথে নিয়ে এগোতে চাইলে কেউ বাংলাদেশকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। দরকার শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী সতর্ক পদক্ষেপ।
সস্তা আবেগ সরিয়ে রেখে সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে বৈরিতার জবাব দিতে হবে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় অর্জিত সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে হবে। একই সাথে সতর্কতা হিসেবে প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে।



