সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। রফতানিমুখী শিল্পে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার জারি করেছে। যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশ রফতানি করে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করেছে তারা এই ঋণ সুবিধা পাবে। এতে নিয়মিত সুদের বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ বা ফি আরোপ করা হবে না।
এটি ভালো উদ্যোগ, কারণ, গার্মেন্ট শিল্পের অনেক শ্রমিক-কর্মচারী প্রতি বছরই ঈদের আগে বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যায় পড়েন। অনেক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদেরকে বেতন-ভাতার দাবিতে রাজপথে নেমে সড়ক অবরোধ করতে হয়। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়। সমস্যা মেটাতে অনেক সময় সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এবার হয়তো তেমনটা ঘটবে না।
লক্ষণীয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাথে তৈরী পোশাক শিল্প মালিকদের বৈঠকের মাত্র দু’দিনের মাথায় এ সিদ্ধান্ত আসে। দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত কাজে পরিণত করার এই দৃষ্টান্ত অবশ্যই বাহবা পাবার যোগ্য।
বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী রফতানি, ক্রয়াদেশ পিছিয়ে যাওয়া ও তারল্য সঙ্কটসহ নানা কারণে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে তারা শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। তাই ঋণ দরকার।
উল্লেখিত কারণে শুধু রফতানিমুখী গার্মেন্ট শিল্প ভুগছে এমন নয়। সব শিল্প ও বাণিজ্যে মন্দা যাচ্ছে। গার্মেন্টের বাইরেও রফতানিমুখী শিল্প আছে। তারাও ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারকে সবার স্বার্থ দেখতে হবে। এমনকি যারা রফতানি করে না তাদেরও। সবার সমস্যা একইভাবে ত্বরিত সিদ্ধান্তে সমাধান করা হলে দেশে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
বিষয়টিকে কেউ কেউ বাঁকা চোখে দেখতে পারেন। কারণ, নতুন সরকারের দেয়া প্রথম এ ধরনের ঋণ সুবিধা এমন এক গোষ্ঠীর জন্য দেয়া হলো, যারা মূলত সুবিধাপ্রাপ্ত। সরকারের ঘোষিত ৪৩টি খাতের আওতায় শতভাগ রফতানিমুখী গার্মেন্ট, হিমায়িত চিংড়ি, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান রফতানি প্রণোদনা পায়। তাদের জন্য নগদ প্রণোদনা, কর ছাড়, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি, চলতি মূলধন ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা সব সময়ই দেয়া হচ্ছে। বিশেষ ঋণও তারা পেতেই পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে আরো বেশি সুবিধা পান রফতানিকারকরা। কারণ তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন।
কিন্তু আমরা ঘরপোড়া গরু। সিঁদুরে মেঘে ভয় পাই। কারণ জুলাই বিপ্লবের আগের পনেরো বছরের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। বৈধ, অবৈধ সব উপায়ে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেয়া হয়েছে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীকে। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপ ঋণের নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করা থেকে শুরু করে খোদ ব্যাংক দখল পর্যন্ত এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি। খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিলের নামে লুটপাটের অবাধ সুযোগ দেয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, সেই ধারা যেন না ফেরে। তেলা মাথায় তেল না ঢালাই ভালো।



