এক-এগারোর দুই কুশীলব গ্রেফতার

বাকিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনুন

এক-এগারোর কুশীলব সবাই রাষ্ট্রের শত্রু। রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রয়োজনে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য হবে না। এদের বিচার করে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে ফের আমরা কার্যকর গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে পারি। একটি সুশৃঙ্খল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের রূপান্তরে এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের নাম এক-এগারো। এদিন রোপিত হয় ফ্যাসিবাদের বীজ। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে গণতন্ত্র খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও বিকশিত হচ্ছিল। ২০০৭ সালের জানুয়ারির ১১ তারিখে গণতন্ত্রের সেই পথচলা থমকে যায়। এর পরের দেড় যুগে সব ধরনের মৌলিক মানবাধিকার বঞ্চিত হয়ে ক্রমে ফ্যাসিবাদী শৃঙ্খলে আটকা পড়ে বাংলাদেশ। নিজ দেশের নিরাপত্তা বাহিনী দেশের জনগণের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে অনেকটা পদানত করে আধিপত্যবাদের মুখাপেক্ষী করে রাখে। নাগরিকরা জীবন, সম্পদ, সম্মান ও ভোটাধিকার হারিয়ে পরাধীন ও অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে দুর্বিষহ এক জীবন কাটিয়েছেন।

ছাত্র-জনতা ৫ আগস্ট নজিরবিহীন এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আধিপত্যবাদের সমর্থনে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদ উৎপাটিত করলেও এক-এগারোর কুশীলবরা বিচারের মুখোমুখি হবেন কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। বিশেষত বিপ্লবের পরও প্রশাসনিক কাঠামোয় পুরনোদের আধিপত্য না কমায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক-এগারোর কারিগররা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। অবশেষে এর পেছনের অন্যতম চরিত্র মাসুদ উদ্দিন ও মামুন খালেদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে।

এক-এগারো ছিল গণতন্ত্র চর্চার একটি ছেদ। বাংলাদেশের এক-এগারো সৃষ্টির সামনের সারিতে ছিল সামরিক বাহিনীর উচ্চাভিলাষী কিছু অসৎ কর্মকর্তা। আধিপত্যবাদীরা সুযোগ বুঝে তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছিল। সাবেক সেনাপ্রধান মইন উদ্দিনসহ এই কর্মকর্তারা যখন তাদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী দুই বছরের সরকার প্রতিষ্ঠা করছিলেন; তাদের কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে দেশের সর্বনাশ করেছেন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে মূলত নিশানা করা হয়েছিল রাজনৈতিক নেতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র এ চক্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলে। তারেক রহমানকে নিষ্ঠুর নির্যাতন করে বিদেশে যেতে বাধ্য করা হয়। একই তরিকায় খালেদা জিয়াকে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে উৎখাত করা হয়। পরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে চিকিৎসায় বাধা দিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে জামায়াতের নেতারাও নিষ্ঠুরতার শিকার হন। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের বাইরে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়; যার সুযোগ নেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতায় এসে। তিনি প্রায় সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেশের সর্বনাশ করেন। এক-এগারোর কুশীলবরা মূলত দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র গুঁড়িয়ে দেন।

এক-এগারো সংঘটনে প্রথমে সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা নেতৃত্ব দিলেও পরবর্তীতে এর সাথে বড় একটি চক্র জড়িত হয়। সরকার তাদের মধ্যে মাত্র দু’জনকে ধরেছে। এ চক্রের প্রত্যেককে শনাক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রের আরেকটি শুভসূচনায় এর বিকল্প নেই। শত্রু চিহ্নিত করতে না পারলে নিরাপদ হওয়া যাবে না।

এক-এগারোর কুশীলব সবাই রাষ্ট্রের শত্রু। রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রয়োজনে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য হবে না। এদের বিচার করে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে ফের আমরা কার্যকর গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে পারি। একটি সুশৃঙ্খল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের রূপান্তরে এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।