নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য

ব্যাখ্যার দাবি রাখে

ভারতের গণমাধ্যম বলেছিল, ঢাকা-দিল্লির দূরত্ব ঘোচানোর ‘কূটনীতিতে’ দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন বলে দিল্লি মনে করে। কিন্তু প্রথম দিনেই ত্রিবেদী দূরত্ব ঘোচানোর যে দাওয়াই পেশ করলেন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। কথার আড়ালে আসলে তিনি কী বলতে চেয়েছেন, তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বাস্তবতা হলো- ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। ভারতের দায় ভারতকেই নিতে হবে। দিল্লিকে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে কাজে।

ঢাকায় ভারতের নতুন নিযুক্ত হাইকমিশনার ৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদী স্থলসীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসেন গত শুক্রবার। এখানে পা দিয়ে কিছু কথা বলেছেন, যা শ্রুতিমধুর। বলেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক তার একমাত্র অগ্রাধিকার। ভূপেন হাজারিকার গানের ভাষায় বলেছেন, দুই দেশের একই আকাশ, একই বাতাস। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। কথাগুলো শ্রুতিমধুর। ভালোবাসা আর আন্তরিকতা থাকলে কোনো সমস্যাই থাকবে না, এটিও সত্য।

এর পরে তিনি আসল চমক দিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের শুধু অভিন্ন সীমান্ত নেই, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের যার পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সাথে ২০ কোটি যোগ করেছি, অর্থাৎ ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই; তা সব একসাথে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না।

ত্রিবেদীর একটি শিল্পী মন আছে। তিনি দক্ষ সেতারবাদক। পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়ার সূত্রে বাংলা ভালো বলেন, বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাশোনাও প্রচুর। তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন, মূলত রাজনীতিক। পশ্চিমবঙ্গে তার রাজনীতির উত্থান। ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও। তার কথায় কূটনীতি নয়, রাজনীতিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সেই বক্তব্য আবার সংস্কৃতির মিঠাই-মোড়কে আবৃত। সে জন্য চট করে বোঝা মুশকিল যে, আসলে বাংলাদেশের সীমান্ত মুছে দিয়ে ভারতের সাথে মিশে যাওয়ার দাওয়াই গেলাতে চাইছেন। অখণ্ড ভারতের স্বপ্নের কথা তুলেছেন। বিষয়টি গুরুতর।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব অস্বীকারের ভারতীয় রাজনীতিকদের যে মজ্জাগত প্রবণতা, ত্রিবেদীর বক্তব্য তারই সূক্ষ্ম বহিঃপ্রকাশ।

তিনি যে একটি স্বাধীন দেশে হাইকমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন সেই বাস্তবতা তার মনে ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয়দের মতো একই স্বপ্ন দেখেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখেননি। এ দেশের মানুষের সাথে ভারতের গত ৫৫ বছরের আচরণ কতটা ভাইয়ের দরদ মাখা ছিল বা এখনো আছে; সেটি উপেক্ষা করেছেন ভারতীয় এই নতুন হাইকমিশনার।

যে মুহূর্তে ত্রিবেদী দায়িত্ব নিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে সীমান্তে বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গোটা সীমান্তজুড়ে চলছে বেআইনি পুশইন।

দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যার কথা সরিয়ে রেখেও প্রশ্ন তোলা যায়, চব্বিশের পরিবর্তনের পর দিল্লি ঢাকার বিরুদ্ধে যেসব বৈরী ব্যবস্থা নিয়েছে নতুন নির্বাচিত সরকারের গত প্রায় চার মাসের মেয়াদে সেসব নিয়ে ভারত কি কোনো সদিচ্ছার প্রমাণ রেখেছে?

একতরফা ভালোবাসা কখনো সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটায় না। ওটা অধীনতা। চব্বিশের আগের ১৭ বছর ধরে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন ও হাসিনার সরকার ঠিক সেটিই করে এসেছে। ত্রিবেদী সেই অধীনতা এখনো চান। তাই তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে আলাদা করে ভাবতে পারেন না।

ত্রিবেদীর এ বক্তব্য বাংলাদেশের সরকারকে আমলে নিতে হবে। তিনি কি কূটনীতিকের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন, নাকি রাজনীতি করতে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।

ভারতের গণমাধ্যম বলেছিল, ঢাকা-দিল্লির দূরত্ব ঘোচানোর ‘কূটনীতিতে’ দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন বলে দিল্লি মনে করে। কিন্তু প্রথম দিনেই ত্রিবেদী দূরত্ব ঘোচানোর যে দাওয়াই পেশ করলেন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। কথার আড়ালে আসলে তিনি কী বলতে চেয়েছেন, তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বাস্তবতা হলো- ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। ভারতের দায় ভারতকেই নিতে হবে। দিল্লিকে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে কাজে।