বিশ্ব রাজনীতিতে এক সময় যা ভাবাই যেত না, ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালায় এবারের জি৭ সম্মেলনে ঠিক তেমন এক ঐতিহাসিক ও চোখ কপালে তোলার মতো ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানদের বার্ষিক এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের দাপুটে এআই কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের ডেকে একদম স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মতোই সমান মর্যাদা দিয়ে একসাথে বসানো হয়েছে। ভবিষ্যতের দুনিয়া ও বিশ্ব নিরাপত্তা আসলে কে নিয়ন্ত্রণ করবে, কার নিয়ম চলবে, আর এআই প্রযুক্তি কিভাবে দেশ চালানো বা বিশ্ব সুরক্ষায় ব্যবহার হবে- তা নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রযুক্তি দুনিয়ার এই হর্তাকর্তাদের মধ্যে এখন লাগাতার আলোচনা, এমনকি মাঝেমধ্যে বিরোধও চলছে।
ঠিক এই কারণেই এআই ল্যাবগুলোর এই শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন একেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে উঠেছেন এবং তাদের এই দাপট বিশ্ব রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক শক্তির উত্থানকে স্পষ্ট করে তুলছে।
সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডানপাশে বসেন ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং বাঁপাশে বসেন গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান ও নোবেলজয়ী ডেমিস হাসাবিস। অন্যদিকে সম্মেলনের আয়োজক ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দু’পাশে ছিলেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এবং সেলসফোর্সের প্রধান মার্ক বেনিওফ।
এভিয়ঁ-লে-বাঁ শহরের সম্মেলন কক্ষে বিশ্বনেতাদের সাথে এক কার্যভোজে অংশ নিতে অল্টম্যান যখন ঢোকেন, তখন দুনিয়ার নামী সব মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তারা তাকে একনজর দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে অল্টম্যানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়।
রাষ্ট্রনেতারা বারবার অল্টম্যানকে বলেন, তারা এআই কোম্পানিগুলোকে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে পাশে চান। তবে অল্টম্যান রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রাষ্ট্রনেতারা যেন তাদের নিজেদের দায়িত্ব এই প্রযুক্তি ল্যাবগুলোর হাতে ছেড়ে না দেন এবং কোনো একক ল্যাবের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।
বৈঠকে অংশ নেয়া আমোদেই, অল্টম্যান ও মেটার প্রধান এআই কর্মকর্তা আলেকজান্ডার ওয়াং প্রত্যেকেই ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাথে আলাদাভাবে ছবি তোলেন। তাদের পেছনে ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা রাখা ছিল, যেখানে সাধারণত কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা চ্যান্সেলররা বসেন।
এছাড়া ওই ওয়ার্কিং লাঞ্চ বা কার্যভোজে ফ্রান্সের মিস্ট্রাল এআই-এর প্রধান আর্থার মেনশসহ জাপান, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের এআই ল্যাবের প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকবিহীন ওই বন্ধ দরজার বৈঠকে এই তিন এআই জায়ান্ট পশ্চিমা শক্তিগুলোকে একজোট হয়ে কাজ করার তাগিদ দেন, যাতে এআই প্রযুক্তিতে তাদের আধিপত্য বজায় থাকে।
আমোদেই বলেন, উন্নত এআই সরঞ্জামের প্রসারের ক্ষেত্রে বিভক্তির ফাঁদে পা দেয়া যাবে না এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে একসাথে থাকতে হবে। অল্টম্যান বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড তৈরি, ঝুঁকি ও সক্ষমতা যাচাই এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনেই পরিচালিত হব, তবে এখানে উপস্থিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে আমরা মনেপ্রাণে সম্মান করি।
সবশেষে হাসাবিস জোর দিয়ে বলেন, আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। সবকিছু ঠিকঠাক চললে আমরা বিজ্ঞানের এক স্বর্ণযুগে প্রবেশ করব। এ জন্য আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের সাথে মিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার।
সূত্র : অ্যাক্সিওস



