মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতি

সঙ্কটের কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী, শঙ্কিত বিশ্বনেতারা

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা সারের চড়া দাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হলে জুন-জুলাই মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালী |সংগৃহীত

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও জি-৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত ও আগে থেকে আঁচ করা যাচ্ছিল এমন অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে যার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২৪ মাইলের হরমুজ প্রণালী এবং ৭ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত মার্কিন হোয়াইট হাউস।

ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে যোগ দেয়া বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও জি-৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এই যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত ও আগে থেকে আঁচ করা যাচ্ছিল এমন অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ চ্যান্সেলর বা ‘চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার’ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ সরকারের অর্থমন্ত্রী র‌্যাচেল রিভস এই যুদ্ধকে একটি ‘ভুল’ ও ‘উন্মাদনা’ হিসেবে উল্লেখ পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে অন্যের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মাসুল কেন বাকি বিশ্ব দেবে? এই বৈঠকগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ত সময়ের আত্মবিশ্বাস ছাড়া বাকি দেশগুলোর মধ্যে উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে এশীয় অর্থলগ্নিকারীরা জ্বালানির তীব্র সঙ্কটের আশঙ্কা করছেন, যদিও মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন যে বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য এই সামান্য অর্থনৈতিক কষ্ট মেনে নেয়া জরুরি।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরাক বর্তমানে তেল উৎপাদন বা রফতানি করতে পারছে না। দেশটির আয়ের ৮৫ শতাংশ জোগান দেয় তেল।

এদিকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো রান্নার গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জ্বালানির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল প্রস্তুত রেখেছে। করোনা মহামারীর সময়কালীন সহায়তার চেয়েও এই অঙ্ক বেশি।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেছেন, এপ্রিল মাস আরো কঠিন হতে পারে। কারণ ফেব্রুয়ারির শেষে ছেড়ে আসা ট্যাংকারগুলো গন্তব্যে পৌঁছে গেলেও নতুন কোনো সরবরাহ নেই। তিনি জানান, একটি ট্যাংকার ফিজি পৌঁছাতে প্রায় ৪০ দিন সময় নেয়।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা সারের চড়া দাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হলে জুন-জুলাই মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

এদিকে, মার্কিন প্রশাসন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সাময়িক এই অর্থনৈতিক ধাক্কা নগণ্য। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে ইসরাইলে বা মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে মার্কিন অবরোধের মুখে ইরানি জাহাজগুলো আর পার পাওয়ার সুযোগ পাবে না।

তবে ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোনাল্ড লেসকিউর মনে করেন, হরমুজ প্রণালীই এই সঙ্কটের মূল গিঁট এবং ইরান বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষতিকে তাদের প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

ব্রিটেনের চ্যান্সেলর র‌্যাচেল রিভস উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের কথা ভাবছেন এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামের মধ্যকার যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ব্যাংকের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি অবশ্য এখনই সুদের হার বাড়ানোর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। সঙ্কটের মেঘ কিছুটা কাটতে শুরু করলেও যদি পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হয়, তবে তার ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

সূত্র : বিবিসি