ফ্রান্সে ২০২৬ সালের শুরু থেকে অভিবাসন ও রেসিডেন্স পারমিট ব্যবস্থায় কঠোর নিয়ম ও বড় ধরণের প্রশাসনিক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ মারি জোসেফ ন্যুনেজ-বেলদার নেতৃত্বে নেয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে ‘প্রেফেকত্যুর’ বা প্রশাসনিক দফতরগুলোর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদেশীদের আইনগত অধিকার সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ফ্রান্সের অন্যতম জাতীয় দৈনিক ল্য ফিগারোকে দেয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে থাকায় অনেক বিদেশী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন সম্পন্ন করতে না পেরে তাদের বৈধ অবস্থান ও অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রক্রিয়াকরণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে চায়।
মন্ত্রী বলেন, ‘রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের গড় সময় ৫৫ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে গত বছর এই সময় ছিল ১১৭ দিন। একইসাথে কিছু প্রেফেকত্যুরে এই সময় ১২০ দিনেরও বেশি।’
সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নবায়ন প্রক্রিয়ায় যেনো কোনো বিদেশী শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন- এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসীদের ক্ষেত্রে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে প্রেফেকত্যুর সমূহে অতিরিক্ত ৫০০ অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক জনবল প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করবে। পাশাপাশি জমে থাকা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুই মিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় নয় লাখ ৩০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন। ২০২৫ সালে মোট নয় লাখ ৫৫ হাজার রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে দুই লাখ পাঁচ হাজার অর্থনৈতিক এবং তিন লাখ ৬৬ হাজার পারিবারিক ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
প্রশাসনিক কাঠামো আরো কার্যকর করতে সরকার একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঠিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রয়োজনীয় নথির তালিকা পুনর্গঠন এবং আবেদনকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কাগজপত্র গ্রহণ সীমিত করা। একই সাথে নবায়ন চলাকালে প্রদত্ত অস্থায়ী সনদ ‘রেসিপিসে’ -এর মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফাইল প্রক্রিয়াকরণে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি যেমন চ্যাটবট ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্স পারমিট প্রথমবার প্রদানের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তা অতিরিক্ত যাচাই ছাড়া নিয়মিতভাবে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে সরকার জানিয়েছে, জালিয়াতির ঝুঁকি অনুযায়ী ফাইল যাচাইয়ের মাত্রা ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হবে। যদিও জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না।
সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশীদের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আনেফ’ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি ত্রুটি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মানবিক সহায়তার অভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে।
ফ্রান্সের অধিকার রক্ষাকারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার বিদেশী অনিচ্ছাকৃতভাবে অনিয়মিত অবস্থায় চলে যাচ্ছেন, যদিও তাদের পূর্বে বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ছিল। বর্তমানে সংস্থাটিতে প্রাপ্ত অভিযোগের প্রায় ৪৫ শতাংশই বিদেশীদের অধিকারসংক্রান্ত।
অভিযোগ রয়েছে, পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অনেকেই সামাজিক সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং বসবাসের অধিকার হারান, যা তাদের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
চলতি মাসের ১০ এপ্রিল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কঁসেই দেতা ‘আনেফ’ প্ল্যাটফর্মের ত্রুটি নিয়ে শুনানি করেছে। সেকুর ক্যাথলিক ও এমাউসসহ ১০টি মানবাধিকার সংগঠন এই বিষয়ে আদালতে আবেদন করেছে।
শুনানিতে বলা হয়, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং এটি সরাসরি সামাজিক সেবা ও মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির সাথে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সেই সব অভিবাসীদের ক্ষেত্রে, যারা ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক দুর্বলতা এবং কঠিন অভিবাসন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
বাদিপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, আনেফের কারিগরি ত্রুটি অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের আইনগত অবস্থানকে অকার্যকর করে তুলছে। অন্যদিকে সরকারি কৌশলী প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়ার সুপারিশ করেছেন- বিশেষ করে আবেদন জমা ও নবায়ন প্রক্রিয়া চলমান থাকার প্রমাণপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে, যা বৈধ অবস্থান বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ফ্রান্সে প্রায় ৪৫ লাখ বিদেশীর বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ছিল, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় আট দশমিক এক শতাংশ।



