আইসল্যান্ডকে এতদিন পৃথিবীর বুকে মশাহীন এক স্বর্গভূমি মনে করা হতো, কিন্তু সেখানেও শেষ পর্যন্ত আগ্রাসন চালিয়েছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তচোষা অতিথি। বিজ্ঞান আর মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে জটিল সব বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সাধারণ মানুষের গল্পে রূপ দিতে ওস্তাদ আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত সাংবাদিক আরেজকি আমিরি। জাপানে বসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন নিয়ে কাজ করা ‘ডেইলি গ্যালাক্সি’র এই প্রধান সম্পাদক জানালেন এই অদ্ভুত খবর। তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে মানুষের তৈরি আধুনিক বিশ্ব আর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা মিলে একটা দেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। আইসল্যান্ড দেশটিকে এতদিন পৃথিবীর বুকে মশাহীন এক স্বর্গরাজ্য ভাবা হতো, সেখানে অবশেষে হানা দিয়েছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি।
একটি লাল ওয়াইনের ফিতা আর বদলে যাওয়া ইতিহাস
বহু বছর ধরে আইসল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো, আপনাদের দেশে মশা নেই কেন? পর্যটক থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীরা, সবার কৌতুহলের জবাব ছিল একটাই—আইসল্যান্ডের খামখেয়ালি শীত। এখানকার শীতের চরিত্র অদ্ভুত। কখনো বরফ গলে পানি হয়ে যায়, আবার পরক্ষণেই তীব্র ঠান্ডায় সব জমে পাথর। মশার ডিম বা লার্ভা একটু ওম পেয়ে যেই না জেগে উঠতে চাইত, অমনি হঠাৎ আসা তীব্র ঠান্ডায় জমে মারা পড়ত। মশার জীবনচক্র আর কখনো পূর্ণতা পেত না।
কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই চেনা উত্তরটা চিরতরে বদলে গেল। আইসল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের কিদাফেল নামের একটি খামারে মথ ধরার জন্য লাল ওয়াইনে ভেজানো একটা সাধারণ ফিতা পেতেছিলেন বিয়র্ন হিয়ালতাসন। ১৬ অক্টোবরের গোধূলিলগ্নে তিনি লক্ষ্য করলেন, ফিতাটার গায়ে এমন কিছু একটা নড়ছে যা সেখানে থাকার কথা নয়। তিনি দ্রুত ওটিকে বন্দী করলেন। ওটা ছিল একটা স্ত্রী মশা। এর পরের কয়েক দিনে মিলল আরো দুটি মশা—একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী।
আইসল্যান্ডের ন্যাচারাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ববিদ ম্যাথিয়াস আলফ্রেডসন এগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত করলেন, আইসল্যান্ডের মাটিতে সত্যি সত্যিই বুনো মশা পা রেখেছে। এই মশার প্রজাতিটির নাম ‘কুলিসেটা অ্যানুলাটা’। ইউরোপ জুড়ে সাধারণ এই মশাটি তীব্র শীত সহ্য করতে পারে।
প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে ঘরে ঢোকার কৌশল
তীব্র ঠান্ডা যে মশার একমাত্র শত্রু নয়, তার প্রমাণ গ্রিনল্যান্ড। সেখানে অন্য প্রজাতির মশা বরফের নিচে বছরের পর বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আইসল্যান্ডের সমস্যা ছিল বারবার তাপমাত্রা ওঠা-নামা করা। যুগ যুগ ধরে এই নিয়মে মশারা এখানে টিকতে পারেনি। কিন্তু কুলিসেটা অ্যানুলাটা নামের এই প্রজাতিটি এক অদ্ভুত কৌশল বেছে নিয়েছে। এরা শীতের দিনে খোলা আকাশের নিচে বা পানিতে না থেকে মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি, আস্তাবল বা বেজমেন্টের উষ্ণ কোণে আশ্রয় নেয়। তীব্র ঠান্ডা কেটে গেলেই এরা উড়ে এসে রক্ত চোষার জন্য তৈরি হয়ে যায়। আর এই আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর বুক থেকে মশাহীন দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল আইসল্যান্ড। এখন কেবল অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশই মশাহীন একমাত্র ভূখণ্ড হিসেবে টিকে রইল।
গরম বাতাস আর জাহাজের খোড়ল
২০২৫ সালটি আইসল্যান্ডের জন্য মোটেও স্বাভাবিক কোনো বছর ছিল না। পুরো দেশজুড়ে তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুমেরু অঞ্চল পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে চার গুণ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে।
তবে কেবল এই গরম বাতাস মশাদের সমুদ্র পার করে দিতে পারেনি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পণ্যবাহী জাহাজের কন্টেইনার বা গাড়ির ভেতরে চড়ে এই মশার দল আইসল্যান্ডে এসে পৌঁছেছে। এর আগেও বিমানে করে দুই-একটা মশা এসেছে, কিন্তু সেগুলো এভাবে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। এবার তারা সরাসরি বাইরে দল বেঁধে বাস করা শুরু করেছে। ডেইলি গ্যালাক্সি আরো বলেছে, আইসল্যান্ডে মশার বংশবৃদ্ধির জন্য জলাশয়ের অভাব নেই, শুধু অভাব ছিল এমন এক প্রজাতির যা এখানকার শীতকে ফাঁকি দিতে পারে। এবার সেই অভাবটাও পূরণ হলো।
আতঙ্ক নয়, তবে সতর্ক নজরদারি
এই মশা কামড়ালে বেশ চুলকায় আর অস্বস্তি হয় ঠিকই, তবে এটি ডেঙ্গু, জিকা বা চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক কোনো রোগ ছড়ায় না। তাই একে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় কোনো হুমকি মনে করা হচ্ছে না, সাধারণ একটি উপদ্রব মাত্র। তবে পাশেই যুক্তরাজ্যে যখন মারাত্মক রোগবাহী এশিয়ান টাইগার মশার সন্ধান মিলছে, তখন আইসল্যান্ডের এই ঘটনাটিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা।
ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, এই তিনটি মশা কেবল শুরু নাকি তারা স্থায়ীভাবে এখানে আস্তানা গেড়ে ফেলেছে। যদি তারা স্থায়ী হতে পারে, তবে আইসল্যান্ডের শান্তিময় দিন শেষ হতে চলেছে। দেশটির জাতীয় গণমাধ্যম ‘আরইউভি’ এই মশার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞানীরা এখন সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেছেন, কোথাও মশা দেখলেই যেন ছবি তুলে বা নমুনা সংগ্রহ করে তাদের জানানো হয়। পৃথিবীর আর সব দেশের মানুষ মশার কামড়ের সাথে যেভাবে আজীবন বাস করছে, আইসল্যান্ডের মানুষকেও হয়তো এখন সেই চেনা অস্বস্তির সাথে মানিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সূত্র : ডেইলি গ্যালাক্সি



