ভারতীয় মুসলমানদের সর্ববৃহৎ পুরোনো প্লাটফর্ম জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ অভিযোগ করেছে, দেশটিতে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে। সংগঠনটির দাবি, ভয় দেখানোর রাজনীতি এবং ইসলামী প্রতীকগুলোর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
সোমবার দেশটির একটি সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়, দুই দিনের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ করা এক পোস্টে জমিয়তের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেছেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ এবং রাজনীতি-নির্ভর বিদ্বেষ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার দাবি, হুমকি, নিপীড়ন বা পেশি শক্তি দেখিয়ে মুসলিমদের কখনো দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরো অভিযোগ করেন, দেশে (ভারতে) ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং মুসলিম ও ইসলামী প্রতীকগুলোকে প্রান্তিক করে দেয়ার চেষ্টা চলছে।
মাওলানা মাদানি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা, মুসলিম ও ইসলামী প্রতীকগুলোর বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা পদক্ষেপ এবং বিদ্বেষভিত্তিক রাজনীতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে মুসলিমরা কখনো মাথা নত করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। ভালোবাসার কাছে তারা মাথা নত করতে পারে, কিন্তু শক্তি, ভয় দেখানো বা অত্যাচারের মাধ্যমে তাদের দমিয়ে রাখা যাবে না।
তিনি আরো দাবি করেন, ভারতে ‘বিদ্বেষের রাজনীতি’ এখন ‘ভয় দেখানোর রাজনীতি’তে পরিণত হয়েছে। মুসলিমদের আতঙ্কিত করে নির্দিষ্ট শর্তের মধ্যে বাঁচতে বাধ্য করাই এই রাজনীতির আসল উদ্দেশ্য।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় আবেগকে উসকে দেয়া হচ্ছে। সরকারকে ‘ভয় ও হুমকি’ দিয়ে নয়; বরং ‘ন্যায় ও নিরপেক্ষতা’র ভিত্তিতে চলা উচিৎ।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে মাওলানা মাদানি দাবি করেন, সদ্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘শুধু হিন্দুদের জন্য কাজ করবেন’ মন্তব্য সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। কারণ, প্রত্যেক মুখ্যমন্ত্রীই রাজ্যের সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার রক্ষার শপথ নেন।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি আরোপ, স্কুলে ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করা, মসজিদ ও মাদরাসার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং ভোটার যাচাই অভিযানের মতো ভোটার ডিলিট করা নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দেশকে একটি ‘ধর্মীয় রাষ্ট্রে’ পরিণত করার ‘পরিকল্পিত চেষ্টা’ চলছে।
মাওলানা মাদানি বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ তাদের ‘আইনি এবং গণতান্ত্রিক লড়াই’ চালিয়ে যাবে।
একইসাথে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ দেশের সমস্ত ন্যায়বিচারপন্থী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে একজোট হয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা এবং সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা পুনরায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানিয়েছে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে করা হলো, যখন কয়েক দিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, আগামী ১৮ মে থেকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। তিনি বেসরকারি স্কুলগুলোকেও এই প্রথা চালু করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। এর আগে চলতি মাসে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ের পর শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘নন্দীগ্রামের হিন্দু মানুষ আমাকে আবার জিতিয়েছেন... আমি নন্দীগ্রামের হিন্দুদের জন্য কাজ করব।’
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় তারা ২০৬টি আসনে জিতেছে। রাজ্যে দীর্ঘদিনের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে তারা। ভোটের ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানের ওপর আঘাত এসেছে বলে বিধানসভায় সরব হয়েছে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকিও।



