চীন ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২১ মে) একে অপরকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি।
এ উপলক্ষে দুই দেশ আবারো তাদের বহু আলোচিত ‘লৌহ ভ্রাতৃত্ব’, ‘সব আবহাওয়ার বন্ধু’ ও ‘সমুদ্রের চেয়ে গভীর বন্ধুত্বের’ সম্পর্ক তুলে ধরেছে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, এই সম্পর্কের ইতিহাস শুধু বন্ধুত্বের নয়, বরং কৌশল, ভূরাজনীতি, গোপন সমঝোতা ও যৌথ স্বার্থেরও গল্প। এ বন্ধুত্বের জন্য ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান এক বিরল কাজ করেছিল। তারা হংকংয়ের পাঁচগুণ বড় ভূখণ্ড চীনকে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।
বেইজিংয়ের সাথে একটি সীমান্ত চুক্তি অনুসারে, পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শাকসগাম উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে হস্তান্তর করে, যে অঞ্চলটিকে ভারত বিতর্কিত কাশ্মিরের অংশ বলে মনে করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য গড়তেই পাকিস্তান এই পদক্ষেপ নেয়। তার আগে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতকে পরাজিত করেছিল চীন।
যদিও একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ও অন্যটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, তবু ভারতের সাথে বিরোধ দুই দেশকে ঘনিষ্ঠ করে তোলে। পাকিস্তান ১৯৫০ সালেই কমিউনিস্ট চীনকে স্বীকৃতি দেয়, যা ছিল তখনকার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। পরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সিয়াটো ও সেন্টো জোটে থেকেও বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে ইসলামাবাদ।
সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পারমাণবিক সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানও একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৬ সালে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হয়। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পরে চীন পাকিস্তানকে প্রযুক্তি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহে সহায়তা করেছিল। যদিও দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করে না।
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ছিল পাকিস্তান। সেই বছর মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে ইসলামাবাদ হয়ে বেইজিং যান। এর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পথ তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনীতি ও অবকাঠামোতেও বিস্তৃত হয়। কারাকোরাম হাইওয়ের নির্মাণের পর ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পাকিস্তানে এসে ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক প্রকল্প ঘোষণা করেন। পাকিস্তান একে ‘গেম চেঞ্জার’ বললেও বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও ঋণের চাপও বেড়েছে। গোয়াদর বন্দর ঘিরে পরিকল্পনাও স্থানীয় বাস্তবতায় বাধার মুখে পড়েছে।
তবে, নিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগ। ২০২১ সালের পর থেকে পাকিস্তানে বিভিন্ন হামলায় অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও বেলুচিস্তানে বড় হামলা চালানো হয়।
এদিকে, বাণিজ্যেও ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে। ২০২৫ সালে চীন পাকিস্তানে ২০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করলেও পাকিস্তান চীনে রফতানি করেছে মাত্র ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীন এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা।
সামরিক খাতে পাকিস্তানের নির্ভরতা আরো বেশি। স্টকহোম ইন্টরন্যানাল পিচ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে চীন থেকে। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ফ্রিগেট ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এখন চীনা প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্ট।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক আবেগের চেয়ে বেশি বাস্তব স্বার্থনির্ভর। ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য— সব মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরকে ছাড়তে পারছে না। আল জাজিরা বলছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতার মাঝেও পাকিস্তান এখনো টানটান দড়ির ওপর হাঁটছে, যেখানে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থে চীন ও পাকিস্তান একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছে।
সূত্র : আল জাজিরা



