মহাকাশ যাত্রায় চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগ : প্রার্থী তালিকায় ২ পাকিস্তানি

চীনের মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচির জন্য মোহাম্মদ জিশান আলি ও খুররম দাউদ নামে দুই পাকিস্তানি নভোচারী মনোনীত হয়েছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

পাকিস্তানের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করে চীনের মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচির জন্য মোহাম্মদ জিশান আলি ও খুররম দাউদ নামে দুই পাকিস্তানি নভোচারী মনোনীত হয়েছেন।

বুধবার (২৩ এপ্রিল) চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি মারফত এ তথ্য জানিয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, এই দুই প্রার্থী শিগগিরই উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য চীনের ‘অ্যাস্ট্রোনাট সেন্টারে’ পাড়ি জমাবেন। সেখানে কঠোর প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাদের মধ্য থেকে একজনকে চূড়ান্তভাবে বেছে নেয়া হবে। মহাকাশে পাড়ি জমানো সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটিই হবেন চীনের মহাকাশ স্টেশনে সফরকারী প্রথম কোনো বিদেশী নভোচারী।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এই অর্জনকে দেশটির মহাকাশ মিশনের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছে।

২০২৬ সালের শেষের দিকে এ স্বপ্নের মহাকাশ মিশনটি শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিয়ানগং স্টেশনে বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত
এই মিশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো পাকিস্তানি নভোচারীর বিশেষ ভূমিকা। তিনি সেখানে ‘পেলোড স্পেশালিস্ট’ হিসেবে কাজ করবেন। সহজ করে বললে, পেলোড স্পেশালিস্ট হলেন একজন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদ, যার প্রধান কাজ মহাকাশযানের যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা নয় বরং মহাকাশ স্টেশনে থাকা বিশেষ বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে গবেষণা চালানো।

এই নভোচারী চীনের ‘তিয়ানগং’ মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে জিরো গ্র্যাভিটি বা ওজনহীন পরিবেশে বিভিন্ন জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। এরমধ্যে থাকবে পদার্থের বিজ্ঞান, ফ্লুইড ফিজিক্স ও জীবপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মূলত ‘পদার্থবিজ্ঞান’ বলাটাই বেশি প্রচলিত এবং ব্যাকরণগতভাবে সঠিক। তবে এখানে যেহেতু মহাকাশে বিভিন্ন ‘বস্তু’ বা ‘পদার্থের’ আচরণ নিয়ে গবেষণা হবে, তাই প্রসঙ্গের খাতিরে ‘পদার্থের বিজ্ঞান’ বা ‘বস্তুবিজ্ঞান’ হিসেবেও একে দেখা যায়।

পদার্থবিজ্ঞান ও বস্তুর আচরণ
মহাকাশের ওজনহীন পরিবেশে কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তু বা পদার্থের গঠন কিভাবে পরিবর্তিত হয়, তা নিয়ে গবেষণা করাই হলো এই বিভাগের কাজ। পৃথিবীতে অভিকর্ষ বলের কারণে অনেক সময় ধাতব সঙ্কর বা নতুন কোনো কেমিক্যাল তৈরির সময় উপাদানের সঠিক মিশ্রণ পাওয়া কঠিন হয়।

কিন্তু মহাকাশে কোনো টান না থাকায় অত্যন্ত নিখুঁত এবং শক্তিশালী নতুন ধরনের ধাতু বা কাচ তৈরি করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক্স বা বিমান শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

ফ্লুইড ফিজিক্স বা প্রবাহী পদার্থবিজ্ঞান
সহজ কথায় বললে, তরল (যেমন পানি বা তেল) ও বায়বীয় পদার্থ মহাকাশে কেমন আচরণ করে, সেটিই হলো ফ্লুইড ফিজিক্স।

পৃথিবীতে পানি সবসময় নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু মহাকাশে পানি গোল বলের মতো ভেসে থাকে। এই বিশেষ পরিবেশে তরল কিভাবে নড়াচড়া করে বা তাপ পরিবহন করে, তা বুঝতে পারলে মহাকাশযানের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতির নকশা আরো উন্নত করা যাবে।

জীবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি
মহাকাশে জীবপ্রযুক্তির গবেষণা মূলত মানবজাতির ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ। সেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষ, ব্যাকটেরিয়া বা উদ্ভিদের ডিএনএ-এর ওপর মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। ওজনহীনতায় গাছের বৃদ্ধি কিভাবে দ্রুত করা যায় বা প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ আরো কার্যকরভাবে তৈরি করা যায় কি-না, এই গবেষণাই হলো মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনে এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখবে।

এসব গবেষণার ফলাফল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিল্পক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবনের পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত চালকের বদলে একজন উঁচু দরের বিজ্ঞানী হিসেবেই তিনি মহাকাশে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই সাফল্যের জন্য দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘সুপারকো’-এর প্রশংসা করেছেন এবং চীন ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত মহাকাশ সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতেই এ সুযোগটি তৈরি হয়েছে। সুপারকো এবং চীনা বিশেষজ্ঞরা মিলে কয়েক ধাপে শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা শেষে এই দুই মেধাবীকে নির্বাচিত করেছেন। প্রথম বিদেশী অংশীদার হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেয়াটা আন্তর্জাতিক মহলে বেইজিং ও ইসলামাবাদের গভীর আস্থার সম্পর্ককেই নতুন করে ফুটিয়ে তুলছে। মহাকাশের অসীম উচ্চতায় পাকিস্তানের এই পদযাত্রা দেশটির তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন এক অনুপ্রেরণার নাম।

সূত্র: দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন