হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার গত ৬৭ দিনে পাল্টে গেছে বিশ্ব রাজনীতির চেনা সমীকরণ। তেহরানের অনুমতি ছাড়া এখন এই নৌপথ দিয়ে একটি জাহাজ পার হওয়াও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সমসাময়িক ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি কেবল একটি নৌ-সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেয়া এক ঘটনা।
জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান পথটি কার্যত রুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ব এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এই অবরোধের ফলে খনিজ তেল ও অ-জৈব পণ্যের রফতানি দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে। যুদ্ধকালীন বিমার খরচ আকাশ ছুঁয়েছে, জাহাজ ভাড়ার হার কয়েক গুণ বেড়েছে এবং দীর্ঘ পথ ঘুরে পণ্য পরিবহনের কারণে সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
তেহরান এখন কোনো অস্ত্র ছাড়াই কেবল ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার নাটাই নিজের হাতে নিয়েছে। প্রতিটি ট্যাংকার এখন তেহরানের সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী, যা যুদ্ধকে সামরিক সংঘাত থেকে এক পূর্ণাঙ্গ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ে রূপ দিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই পরিস্থিতি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্কটে নিজেদের নৌবহরকে দীর্ঘ সময় মোতায়েন রাখা এবং বিকল্প সাপ্লাই লাইন সামলাতে গিয়ে মার্কিন কোষাগার এখন শূন্য হওয়ার পথে। দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মার্কিনিদের নাভিশ্বাস উঠছে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে আরো সংকুচিত করে তুলছে।
দীর্ঘমেয়াদী এই অবরোধ আর মুদ্রাস্ফীতির চাপে মার্কিন শিল্প খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমেই ধসে পড়ছে। দশকব্যাপী মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের পর এই নতুন ধাক্কা ওয়াশিংটনের জন্য সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইসরাইল এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক ছায়া যে জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, তা গত দুই মাসের এই অচলাবস্থায় স্পষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাও এই সঙ্কটের কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
অন্যদিকে, এই সঙ্কটের ছায়ায় নিজের অবস্থান শক্ত করে নিচ্ছে চীন। পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর নির্ভরশীল বেইজিং এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী কৌশল নিয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি এবং নতুন নতুন স্থলপথ উন্নয়নের মাধ্যমে চীন মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার মূল কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর এই নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা এতদিন নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর ভরসা করত, সেই উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে মার্কিন ছাতা আর কাজ করছে না, তাই তারা এখন চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি ইরানের সাথেও নতুন করে সমঝোতার পথ খুঁজছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বিশ্ব এখন একটি বহুমুখী ব্যবস্থার দিকে মোড় নিচ্ছে যেখানে ক্ষমতার নতুন ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই সামুদ্রিক পানিপথ।



