মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানে স্থল অভিযান চালাতে যাচ্ছে?

যুদ্ধে কোনো এলাকা দখল করা তো অর্ধেক লড়াই মাত্র, তা ধরে রাখাই আসল ও কঠিন কাজ। পারস্য উপসাগরে ইরানের এই দ্বীপগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হওয়ায় কোনো আক্রমণকারী বাহিনী সেখানে ঢুকলে তারা পুরোপুরি রসদ সরবরাহের লাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। জ্বালানি, গোলাবারুদ থেকে শুরু করে আহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য নৌ বা আকাশপথের ওপর ভরসা করতে হবে। এই সাপ্লাই লাইনে একটু চাপ পড়লেই আক্রমণকারী বাহিনী বিচ্ছিন্ন ও চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
স্থল অভিযানের কাল্পনিক চিত্র
স্থল অভিযানের কাল্পনিক চিত্র |সংগৃহীত

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরে ইরানের কিছু দ্বীপ দখল করার মতো বিকল্পগুলো নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে বেশ চর্চা হচ্ছে। এর পর থেকেই জনমনে আবারও সেই চেনা প্রশ্নটি ঘুরেপাক খাচ্ছে—ওয়াশিংটন কি আসলেই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো স্থল অভিযানের দিকে এগোচ্ছে, নাকি এই দৃশ্যপটটি আসলে কোনো বাস্তব সামরিক পরিকল্পনা নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আর রাজনৈতিক চাপের একটা হাতিয়ার মাত্র? মূল প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন কি আকাশপথ আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গণ্ডি পেরিয়ে ইরানের ভেতরে স্থল অভিযানের মতো পরবর্তী পদক্ষেপটি নিতে পারবে?

ইরানের সংবাদ মাধ্যম ওয়ানা রোববার (১৯ জুলাই) জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো আবেগঘন প্রতিক্রিয়া বাদ দিলে এর উত্তর কিন্তু কয়েকটা সাধারণ বাক্যে দেওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক যুদ্ধে কোনো একটা বিকল্প টেবিলে রাখা আর সেটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করার ক্ষমতার মধ্যে বিশাল ফারাক থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে হরমুজগানের সংযোগ পথগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর আগে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের নৌঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামোগুলো। এই পরিবর্তনের পর প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কি ইরানকে পুরোপুরি দখল করা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য স্থল অভিযান মানেই ইরানকে পুরোপুরি দখল করা নয়। বিশাল ভূগোল, বিপুল জনসংখ্যা, শক্তিশালী সামরিক কাঠামো আর কৌশলগত অবস্থানের একটি দেশকে দখল করা আধুনিক যেকোনো সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হবে। এর জন্য হাজার হাজার লড়াকু সেনা, বিমান সহায়তা, সাঁজোয়া যান, গোলন্দাজ বাহিনী আর নিরাপদ লজিস্টিকস লাইনের প্রয়োজন হবে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো স্থল অভিযানের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেও, তবে তা পূর্ণ দখলের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালির কাছের সংবেদনশীল দ্বীপগুলো সাময়িকভাবে কবজা করার মতো একটি সীমিত অভিযান হতে পারে।

তবে মূল চ্যালেঞ্জটা এখানেই। যুদ্ধে কোনো এলাকা দখল করা তো অর্ধেক লড়াই মাত্র, তা ধরে রাখাই আসল ও কঠিন কাজ। পারস্য উপসাগরে ইরানের এই দ্বীপগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হওয়ায় কোনো আক্রমণকারী বাহিনী সেখানে ঢুকলে তারা পুরোপুরি রসদ সরবরাহের লাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। জ্বালানি, গোলাবারুদ থেকে শুরু করে আহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য নৌ বা আকাশপথের ওপর ভরসা করতে হবে। এই সাপ্লাই লাইনে একটু চাপ পড়লেই আক্রমণকারী বাহিনী বিচ্ছিন্ন ও চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাছাড়া বছরের পর বছর ধরে এই দ্বীপগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই জোরদার করা হয়েছে যে, কোনো আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আক্রমণের পর কী হবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি দীর্ঘ সময় সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে? ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হওয়া ইরাকি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। এর ভৌগোলিক বিশালতা ও কয়েক দশকের প্রতিরক্ষার অভিজ্ঞতা যেকোনো স্থল অভিযানকে বহুগুণ জটিল করে তোলে। এর সাথে যোগ হয় পারস্য উপসাগরের চরম গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, যা মানুষের সহ্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপগুলোতে ঢুকে পড়তে পারবে কি না, সেটা কোনো বড় প্রশ্নই নয়; আসল এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভেতরে ঢোকার পর তৈরি হওয়া চরম বৈরী পরিস্থিতি তারা আদৌ সামাল দিতে পারবে তো? এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমীকরণ। বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে যেকোনো ধরনের স্থল অভিযানে সেনা হতাহত হওয়া কিংবা তাদের সৈন্যরা যুদ্ধবন্দি হওয়ার ঝুঁকি থাকে বহুগুণ বেশি, যা ওয়াশিংটনের যেকোনো সরকারের জন্য ঘরের মাঠে এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

সুতরাং, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে থাকা ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানের এই বিপজ্জনক বিকল্পটিকে হয়তো খাতা-কলমে বা তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। এর পেছনে থাকা পর্বতসম সামরিক ঝুঁকি, মারাত্মক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং রসদ সরবরাহের চরম লজিস্টিকস সংকট শেষ পর্যন্ত যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথকে ওয়াশিংটনের জন্য অসম্ভব রকমের কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।