গাজার উদ্দেশে এগিয়ে চলেছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র নতুন মিশন

ইসরাইল সরকারের দীর্ঘদিনের কঠোর অবরোধ ভেঙে গাজার সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেয়াই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
শুরু হয়েছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ২০২৬ সালের বসন্তকালীন মিশন
শুরু হয়েছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ২০২৬ সালের বসন্তকালীন মিশন |আনাদোলু অ্যাজেন্সি

গাজার অবরোধ ভেঙে ত্রাণ পৌঁছাতে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নতুন মিশন শুরু করেছে। ইতালি থেকে ৬৫টি নৌকা নিয়ে এ যাত্রার শুরু। ঝুঁকি থাকলেও আন্তর্জাতিক সমর্থনে এটি মানবিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে রোববার শুরু হয়েছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ২০২৬ সালের বসন্তকালীন মিশন। আবারো উত্তাল সমুদ্র চিরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার দিকে এগোচ্ছে মানবিকতার বিশাল নৌবহরটি। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট মিডলইস্ট মনিটর এ খবর দিয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ইসরাইল সরকারের দীর্ঘদিনের কঠোর অবরোধ ভেঙে গাজার সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেয়াই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

গত ১২ এপ্রিল স্পেনের শহর বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই বহরটি ইতালির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিসিলিতে এসে সাথে আরো কিছু শক্তি যোগ করেছে। সিসিলির সিরাকিউজ ও অগাস্টা শহর থেকে ইতালীয় সক্রিয়কর্মী এবং বেশ কিছু নৌকা এই বহরে যোগ দেয়।

অগাস্টা ইয়ট হারবারে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার সময় নৌকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫টিতে। একটি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক পরিকল্পনা মেনে ভূমধ্যসাগরের নীল পানিরাশি চিরে নৌকাগুলো এখন গাজার পথে।

মাঝসমুদ্রে গ্রিনপিসের একটি জাহাজ এই নাগরিক উদ্যোগে সংহতি জানিয়ে বহরে যোগ দিলে সবার মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রার সময় ফিলিস্তিনের সমর্থনে স্লোগান আর মশাল জ্বালিয়ে বিদায় জানানো হয় কর্মীদের। চোখেমুখে অনিশ্চয়তা থাকলেও সবার কণ্ঠে ছিল গাজার উপকূলে পৌঁছানোর একরোখা সংকল্প।

মিডলইস্ট মনিটরের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ আহমেদ বলেছেন, গাজা অবরোধের এই জটিল রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ‘ফ্লোটিলা’ বা এই নৌ-অভিযান মূলত বিশ্ববিবেকের এক প্রতিবাদী প্রতীক। ২০০৭ সাল থেকে ইসরাইল যখন গাজাকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন থেকেই আন্তর্জাতিক অ্যাক্টিভিস্টরা সমুদ্রপথে এই অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে আসছেন।

এই ‘ফ্লোটিলা’ শব্দটির ইতিহাসও বেশ পুরনো। এটি স্প্যানিশ শব্দ ‘ফ্লোটা’ থেকে এসেছে, যার মানে ছোট নৌবহর। মূলত সামরিক বা বিশেষ প্রয়োজনে ছোট ছোট জাহাজের দলবদ্ধ যাত্রাকেই ফ্লোটিলা বলা হয়। বর্তমান সময়ে এটি কেবল ত্রাণবাহী জাহাজ নয়, বরং এটি ইসরাইল সরকারের অমানবিক অবরোধের বিরুদ্ধে এক বিশাল রাজনৈতিক ঢাল। যারা এই নৌকায় আছেন, তারা জানেন গাজার সমুদ্রসীমায় পৌঁছানো কতটা বিপজ্জনক, তবুও তারা যাচ্ছেন কেবল এই বার্তা দিতে যে, গাজা একা নয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ।

এই মিশনটি ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র জন্য দ্বিতীয় দফার প্রচেষ্টা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা একবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অক্টোবরে আন্তর্জাতিক পানিসীমায় থাকাকালীন ইসরাইল বাহিনী সেই বহরের ওপর হামলা চালায় এবং শত শত কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। বন্দীদেরকে হেনস্তা করে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের অর্থকড়িও চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।

তবুও থেমে থাকেনি এই মানবিক অভিযাত্রা। এবারের যাত্রায় মানুষের ঢল আর গ্রিনপিসের মতো বড় সংস্থার সমর্থন প্রমাণ করছে যে গাজার ওপর অব্যাহত এই অবিচারের বিরুদ্ধে দুনিয়াজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমেনি, বরং বাড়ছে।

ইসরাইল দাবি করে যে নিরাপত্তার সাথে আপস না করতেই তারা এই অবরোধ দিয়েছে, কিন্তু সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য এ এক ‘খোলা জেলখানা’। এই জেলখানার দেয়াল ভাঙতে বড় কোনো কামানের দরকার নেই, মাঝেমধ্যে একঝাঁক সাদা পাল তোলা নৌকাই বিশ্বের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে দিতে যথেষ্ট।

সমুদ্রের ঢেউ ডিঙিয়ে এই ৬৫টি নৌকা গাজার উপকূলে ভিড়তে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের এই যাত্রা এরই মধ্যে বিশ্বরাজনীতির টেবিলে এক বড় ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলেছে।

এদিকে, এর আগের ফ্লোটিলার অন্যতম সদস্য ছিলেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী ড. শহিদুল আলম। ফ্লোটিলার অন্য সদস্যদের সাথে তাকেও আটক করে ইসরাইলের কারাগারে বন্দী রাখা হয়েছিল। কারাগারে তারা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এছাড়া, ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তার কাছে থাকা ডলারসহ দামি জিনিসপত্র চুরি করেছে বলে মুক্তি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এবারে ফ্লোটিলার যাত্রা শুরুর সময় আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন ড. আলম। কিন্তু হাড় ভেঙ্গে যাওয়ায় তিনি ফ্লোটিলায় অংশ নিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন নয়া দিগন্তকে। হাড় জোড়া লাগতে চার সপ্তাহ লাগবে এবং তারপর তিনি ফ্লোটিলায় যোগ দেয়ার চেষ্টা করবেন বলেও জানান।