ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলো আজ রোববার (৭ জুন)। এই সঙ্ঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়েছে।
ইরান একে একটি উসকানিহীন আগ্রাসন বলে আখ্যায়িত করেছে। এরইমধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ছাড়াও লেবাননে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে আক্রমণ থামায়নি ইসরাইল। লেবাননে এখন পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা এই মার্কিন-ইসরাইলি হামলার নিন্দা না করলেও যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং ইরানে কোনো শাসন পরিবর্তনের বিরোধিতাও করেছে।
পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা করেছে। তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারের অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো এখন একটি কূটনৈতিক সমাধানের দাবি জানাচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করছে।
গত বুধবার ইসরাইল ও লেবানন তাদের যুদ্ধবিরতি নবায়ন করলেও লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ হয়নি। ইরান বলছে, এই হামলা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই এই যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়েছে। ইরান এসব অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যার বিপরীতে ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো দেশগুলো বেশ সঙ্কটে পড়েছে।
ওমান মার্কিন নীতির তীব্র সমালোচনা করে একে একটি অনেক বড় ভুল ও বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেছে। কাতার ও কুয়েত তাদের দেশে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইরাক এই মার্কিন-ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তির জন্য যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখনো হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এবং জ্বালানি সঙ্কটের কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আচমকা এই হামলার কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ঘোষণা করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে বিশ্বের অনেক দেশই বুঝতে পারছে না এই সঙ্ঘাত কতদূর গড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু আলোচনার মূল মধ্যস্থতাকারী ওমান এই পরমাণু আলোচনা চলাকালে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি বলেন, এই সঙ্ঘাত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা বিশ্ব শান্তির কোনো উপকারে আসবে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য মার্কিন মিত্রদের মতো ওমানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই। তা সত্ত্বেও ওমান এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যখন ইরান উপসাগরজুড়ে মার্কিন সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক পাল্টা হামলা চালায়।
গত মার্চ মাসে ওমানের দুকম বাণিজ্যিক বন্দর ও সালালাহ বন্দরে বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। ১৩ মার্চ সোহার প্রদেশে ড্রোন হামলায় দু‘জন বিদেশী নাগরিক নিহত হন।
তবে ওমানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা ইরান এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ওমান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগ তুলেছে।
অন্যদিকে, কাতার তাদের দেশে থাকা মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং বেশ কিছু ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে কাতার।
দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ট্রাম্পকে ফোনে বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং উত্তেজনা এড়াতে সব পক্ষের রাজনৈতিক সমাধান ও আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা সমর্থন করা এবং বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগের পথ জোরদার করায় কাতারের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প।
কাতার ও কুয়েত তাদের ওপর চালানো হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বললেও সঙ্কটের একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান চাচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন সরাসরি মার্কিন সামরিক স্বার্থের সাথে যুক্ত থাকায় তারা ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। বাহরাইন এই বিষয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আনার চেষ্টা করলেও চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে তা বানচাল হয়ে গেছে। সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগরের বন্দরগুলো ব্যবহার করে তেল রফতানি সচল রাখলেও তারা এই সঙ্ঘাতের মারাত্মক পরিণতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত যুদ্ধের কয়েকদিন আগেই ইসরাইল সফর করায় একটি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। ভারত এই হামলার সরাসরি নিন্দা না করলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত তাদের এক কোটি প্রবাসী শ্রমিক এবং তেল আমদানির নিরাপত্তার স্বার্থে হরমুজ প্রণালী সচল রাখার দাবি জানিয়েছে। ভারতের সাধারণ মানুষ এখন গ্যাসের তীব্র সঙ্কটে পড়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ এই যুদ্ধের ফলে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে এবং সব ধরনের সঙ্ঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাদের নৌবাহিনী সমুদ্র থেকে বিপদে পড়া শতাধিক ইরানি নাবিককে উদ্ধার করেছে।
এশিয়ায় জাপানের মতো দেশগুলো তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার জন্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান এই যুদ্ধের প্রভাবে তীব্র জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে। ফিলিপাইন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
চীন ও রাশিয়া এই সঙ্কটে পুরোপুরি মার্কিন ও ইসরাইলি বিরোধী অবস্থান ধরে রেখেছে। বেইজিংয়ে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে চীন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ নতুন করে শুরু করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে।
রাশিয়া এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পূর্বপরিকল্পিত কৌশল বলে উল্লেখ করেছে এবং ইরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমনকি একটি শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে পুতিন সরকার।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে অস্বীকার করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তবে ব্রিটেন তাদের ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে জ্বালানি নেয়ার সুবিধা দেয়া অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কানাডা ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করলেও ব্রাজিল এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। মেক্সিকো রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও আগামী ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানি দলকে আতিথেয়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। তবে মার্কিন প্রশাসন বিশ্ব সংস্থাকে তোয়াক্কা না করে উল্টো ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য জাতিসঙ্ঘকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়া এই যুদ্ধ এখন এক ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা



