তেহরান আর ওয়াশিংটনের মধ্যে এখন এক অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে। একে না বলা যাচ্ছে শান্তি, না বলা যাচ্ছে যুদ্ধ। দু’দেশই এখন এক অনিশ্চিত খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে একে অপরের ধৈর্য পরীক্ষা করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ইরানের নেতারা- উভয়পক্ষই ভাবছে তারা বিপক্ষকে ক্লান্ত করে মাঠ থেকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু এই যে মাঝখানের একটা ‘লিম্বো’ বা ঝুলে থাকা অবস্থা। এ অবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্যও এক বড় ঝুঁকি।
তেহরান মনে করছে, তারা লড়াইয়ের অর্থনৈতিক ধাক্কা সইবার ক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে বেশি রাখে। কিন্তু আলোচনার টেবিলে কোনো অগ্রগতি না থাকায় তারা ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের আচমকা হামলার ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসে এ বিষয় আরো লিখেছেন এরিকা সলোমন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সেই রক্তক্ষয়ী ৪০ দিনের যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি, এমনকি গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের রেশও কাটেনি।
তেহরান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাসন করিমি বলছেন, বর্তমান অবস্থাটা অনেকটা সেই অসমাপ্ত লড়াইগুলোর মতো। যেখানে সাময়িকভাবে অস্ত্র বিরতি এসেছে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি।
ইরানের গণমাধ্যম ‘খোরাসান’ এই পরিস্থিতিকে বলছে ‘কৌশলগত শূন্যতা’। তারা মনে করে, দু’পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের বিশাল খরচ আর ক্ষয়ক্ষতি বাঁচাতে এক পা পিছিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু গায়ের জোর খাটানোর মানসিকতা থেকে চুল পরিমাণও হটেনি। সরাসরি ছোটখাটো যুদ্ধের চেয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আসলে বেশি ভীতিজনক।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার একটা চেষ্টা শুরু হয়েছিল, কিন্তু গত সপ্তাহান্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আর জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইসলামাবাদ পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
ট্রাম্পের দাবি, ইরান শুধু সময় নষ্ট করছে। অন্যদিকে ইরানের সাফ কথা, তাদের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নৌ-অবরোধ বসিয়েছে, তা না সরালে কোনো সরাসরি আলাপ হবে না। এই ইঁদুর-বেড়াল খেলার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমান, রাশিয়া আর পাকিস্তান চষে বেড়াচ্ছেন। ইরান চাচ্ছে ওমান আর পাকিস্তানের সাথে সমন্বয় করে এমন একটা পথ বের করতে যাতে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
ইরানের ভেতরে এখন এক বড় সঙ্কট দানা বাঁধছে। ওষুধের অভাব আর কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
দেশটির অর্থনীতিবিষয়ক পত্রিকা ‘দুনিয়া-এ-এক্তেসাদ’ (অর্থনীতির বিশ্ব) জানাচ্ছে, যদি কোনো চুক্তি না হয় তবে মুদ্রাস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা ১২০ শতাংশ ছাড়ানোও বিচিত্র নয়।
কিন্তু তা সত্ত্বেও লন্ডনের ‘বোর্স অ্যান্ড বাজার’ ফাউন্ডেশনের প্রধান এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিদজ মনে করেন, ইরান অন্তত তিন থেকে ছয় মাস এই চাপ সয়ে নিতে পারবে। উল্টা হরমুজ প্রণালীতে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ট্রাম্পের জন্যই সেটা বড় মাথা ব্যথার কারণ হবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে মার্কিন জনগণের রোষের মুখে পড়বেন ট্রাম্প।
ইরানের জন্য বড় সমস্যা হলো এই ‘শান্তি নেই, যুদ্ধও নেই’ দশা। এই অবস্থায় থাকলে তারা সবসময় একটা অদৃশ্য হুমকির মুখে থাকে।
হাসান করিমির বরাত দিয়ে এরিকা সলোমন মনে করেন, তেহরানের উচিত এখন সাহসের সাথে একটা পূর্ণাঙ্গ চুক্তির রূপরেখা দেয়া।
এর আগে আলোচনার চুন খেয়ে তেহরানের মুখ পুড়েছে। জুনের যুদ্ধ আচমকা শুরু করেছিল আলোচনা চলাকালেই। তাছাড়া অতীতে করা জেসিপিও নামের পরমাণু সমঝোতাও একটানে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন খোদ ট্রাম্প।
আপাতত এক অদ্ভুত গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যে। দু’পক্ষই খাদের কিনারায় বসে দেখছে, কে আগে পা ফসকায়। এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কার জয় বয়ে আনবে, তা এখন সময়ের হাতে।
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস



