ইরানের বলেছে, মাঝসমুদ্রে মার্কিন বাহিনী অনেকটা জলদস্যুদের মতো তাদের তেলের জাহাজ কবজা করেছে। এই বিষয়টিকে স্রেফ চুরির পর্যায়ে না রেখে সরাসরি ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে তেহরান। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই কড়া অভিযোগ জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি।
বুধবার ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
তাসনিম নিউজ উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে মাঝেমধ্যেই এমন সব ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সম্প্রতি সমুদ্রের নীল জলরাশিতে ঠিক তেমনই এক ‘সিনেমাটিক’ অথচ ভয়ঙ্কর বেআইনি কাণ্ড ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এখন বিশ্ব রাজনীতি বেশ উত্তপ্ত।
আমির সাঈদ ইরাভানি তার চিঠিতে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সমান। বিশেষ করে ‘এমটি ম্যাজেস্টিক’ এবং ‘এমটি টিফানি’ নামের দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল যেভাবে মার্কিনিরা হাতিয়ে নিয়েছে, তা কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, খোদ মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল বা সরকারি আইনি কর্মকর্তারা এই জাহাজ আটকের ঘটনাটি বেশ গর্বের সাথেই প্রচার করেছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি যে একটি পরিকল্পিত অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন- সেই স্বীকারোক্তি তো মার্কিনিরা নিজেরাই দিয়ে দিচ্ছে। তাদের এই দাপট আসলে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন বাণিজ্যের পথে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পুরো ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ অভ্যন্তরীণ আইনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অন্যের সম্পত্তিতে হাত দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এক দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ম অন্য দেশের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। ইরাভানি তার চিঠিতে ১৯৭৪ সালের জাতিসঙ্ঘের একটি প্রস্তাবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে যে কোনো দেশের নৌবহরের ওপর অন্য দেশের সশস্ত্র হামলা চালানো মানেই হলো সরাসরি আগ্রাসন।
ইরানের অভিযোগ, মার্কিন বাহিনী মাঝসমুদ্রে জাহাজ থামিয়ে তাতে জোর করে উঠে পড়ার যে সংস্কৃতি তৈরি করছে, তা আসলে জলদস্যুগিরিরই আধুনিক রূপ। এটি শুধু ইরানের ক্ষতি করছে না, বরং পুরো সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকেই আজ হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান এই চিঠিতে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এই অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের জানমাল রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার তেহরানের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে ওই জাহাজগুলো এবং লুট করা তেল ফেরত দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একইসাথে ইরান নিরাপত্তা পরিষদকে অনুরোধ করেছে যাতে তারা এই মার্কিন ‘জলদস্যুগিরি’র বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়।
কারণ আজ যদি কোনো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে অন্যের জাহাজ ছিনতাই করে, তবে ভবিষ্যতে কোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজই আর নিরাপদ থাকবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে সমুদ্রের এই লড়াই যে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করতে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সব মিলিয়ে, তেলের বাজারের দখল আর ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের এই লড়াই এখন সরাসরি জাতিসঙ্ঘের টেবিলে আছড়ে পড়েছে।



