চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে দীর্ঘ বৈঠক, আলোচনাকে যেভাবে বর্ণনা করলেন ট্রাম্প

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম চীন সফর করছেন ট্রাম্প। গতকাল বুধবার রাতে তিনি বেইজিং পৌঁছালে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং |সংগৃহীত

বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক দুই ঘণ্টা ধরে চলে, যা নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ। আলোচনা কেমন হয়েছে, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প শুধু এক শব্দে বলেছেন- ‘চমৎকার’।

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম চীন সফর করছেন ট্রাম্প। গতকাল বুধবার রাতে তিনি বেইজিং পৌঁছালে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।

এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি তার প্রথম মেয়াদেও বেইজিং ঘুরে যান এবং তার ওই সফরের পর মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্ট আর দেশটিতে যাননি।

গত বছর ট্রাম্প আরোপিত শুল্ককে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই সফরের দিকে নজর বিশ্বের।

এছাড়া ইরানকে প্রভাবিত করতে চীনের ভূমিকা দেখতে চাইতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, এমন আলোচনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে চীনে ট্রাম্পের দু্ই দিনের এই সফর এবার নানা কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সেটারই ইঙ্গিত করে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক শুরুর আগে উদ্বোধনী বক্তব্যে শি জিনপিংও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হওয়া উচিত এবং ‘পুরো বিশ্বই তা দেখছে’।

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টার দিকে ট্রাম্প পৌঁছালে তাকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেয়া হয়। বড় একটি সামরিক দল গার্ড অব অনার দিয়ে এবং ডজনখানেক শিশু পতাকা নাড়িয়ে তাকে স্বাগত জানায়।

লাল গালিচায় করমর্দনের সময় দুই নেতার মধ্যে আন্তরিক পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।

পরে তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে যা প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ। এরপর দুই প্রেসিডেন্ট টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতাদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি।

তবে বৈঠকের আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে শি জিনপিং বলেছেন যে, তাইওয়ানের বিষয়টি দুই দেশকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তিনি স্বশাসিত এই দ্বীপটিতে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বিলম্বিত বা হ্রাস করার জন্য চাপ দিচ্ছেন, যেটিকে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩০টি প্রধান প্রযুক্তি সংস্থার প্রধান নির্বাহীদের সাথে নিয়ে বেইজিংয়ে এসেছেন এই আশায় যে, চীন আরো আমেরিকান সংস্থার জন্য তার দরজা খুলে দেবে।

ট্রাম্পের সাথে এই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা, যাদের মধ্যে টেসলার ইলন মাস্ক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং রয়েছেন।

‘চমৎকার’ আলোচনা

গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠক শেষে ট্রাম্প ও শি একসাথে টেম্পল অব হেভেনে যান।

এটি এমন এক মন্দিরের অংশ, যেখানে প্রাচীনকালে চীনের সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন।

টেম্পল অব হেভেনে উপস্থিত সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে এসময় জিজ্ঞেস করেন যে আলোচনা কেমন চলছে?

জবাবে তিনি বলেন, ‘চমৎকার’।

দ্বিতীয় এক প্রশ্নকারী জানতে চান তিনি তাইওয়ান নিয়ে কথা বলেছেন কি না।

জবাবে ট্রাম্প তার আগের কথার ধারাবাহিকতায় বলেন, ‘চমৎকার জায়গা, অবিশ্বাস্য, চীন খুব সুন্দর’।

আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাইওয়ান নিয়ে কথা বলেছেন কি না, ট্রাম্প সরাসরি সামনে তাকিয়ে থাকেন, শিও একইভাবে সামনে তাকিয়ে থাকেন।

তৃতীয়বার প্রশ্নটি করা হয়, যখন দুই নেতা ঘুরে মন্দিরের সিঁড়ির দিকে এগোতে শুরু করেন।

শি’র ‘সতর্কতা’

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য ‘সংঘাতের’ বিষয়ে সতর্ক করেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি এটিকে ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি অনুযায়ী শি বলেন, ‘এটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সাধারণভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু এটি যথাযথভাবে সামলানো না হলে দুই দেশ মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সংঘাতেও গড়াতে পারে, যার ফলে সামগ্রিক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পৌঁছে যেতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তির সাথে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’

একইসাথে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ওই প্রণালিতে শান্তিই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলের ক্ষেত্র।’

উল্লেখ্য, তাইওয়ান একটি স্বশাসিত দ্বীপ, যাকে বেইজিং নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দখল করার সম্ভাবনা নাকচ করেনি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে বেইজিং, যা তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ এবং দ্বীপটির মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন বা ১১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। ওই সময় বেইজিং এর নিন্দা করে।

‘আপনার বন্ধু হওয়াও সম্মানের’

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরুর আগে উদ্বোধনী বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আজ শি জিনপিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা তার জন্য ‘সম্মানের’ বিষয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে আমরা তা সমাধান করেছি। আমি আপনাকে ফোন করতাম, আপনি আমাকে ফোন করতেন। মানুষ জানে না- যখনই আমাদের কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা খুব দ্রুত তা সমাধান করেছি।’

‘আমি সবাইকেই বলি, আপনি একজন মহান নেতা,’ বলেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সফরে তিনি বিশ্বের ‘সেরাদের (ব্যবসায়িক নেতাদের)’ সাথে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ এখানে শুধু শীর্ষ ব্যক্তিরাই এসেছেন আপনাকে সম্মান জানাতে।’

ট্রাম্প আরো বলেন, কেউ কেউ একে ‘এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শীর্ষ সম্মেলন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তিনি তাদের আলোচনার জন্য ‘অত্যন্ত’ আশাবাদী।

‘আপনার সাথে থাকা সম্মানের, আপনার বন্ধু হওয়াও সম্মানের,’ বলার সাথে তিনি এটাও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো’ হবে।

দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে শি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের বৈঠকের দিকে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে রয়েছে। এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি এমন পরিবর্তন এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত ঘটছে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল ও অস্থির।’

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারবে কি না, একসাথে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আরো স্থিতিশীলতা আনতে পারবে কি না; দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে কি না- প্রশ্নগুলোও তোলেন শি।

তিনি আরো বলেন, ‘এগুলোই ইতিহাস, বিশ্ব ও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যার উত্তর আপনাকে ও আমাকে বড় দেশগুলোর নেতা হিসেবে দিতে হবে।’

‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা থেকে লাভবান হয় এবং মুখোমুখি অবস্থান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়’- এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত; আমাদের একে অপরকে সফল হতে সহায়তা করা উচিত এবং নতুন যুগে বড় দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সঠিক পথ খুঁজে বের করতে হবে।’

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায় ট্রাম্পের সাথে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতাদের কয়েকজন সেই কক্ষে প্রবেশ করছেন, যেখানে দুই প্রেসিডেন্ট বৈঠক করছিলেন।

পরবর্তী সময়ে তাদের ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় এবং সাংবাদিকরা তাদের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চান।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইলন মাস্ক সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এখানে ‘অনেক ভালো কাজ সম্পন্ন’ করতে চান।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং নাকি বলেছেন, ‘বৈঠকগুলো অত্যন্ত ভালো হয়েছে।’

বৈঠক কেমন হয়েছে জানতে চাইলে অ্যাপলের প্রধান টিম কুক শুধু ‘থাম্বস আপ’ দেখান।

এর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য দলগুলো গতকাল বৈঠকে ‘সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ফলাফল’ অর্জন করেছে।

‘বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে যে বাণিজ্য যুদ্ধে কোনো পক্ষই বিজয়ী হয় না এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক লাভ ও পারস্পরিক কল্যাণের সহযোগিতা,’ শি-কে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

তিনি আরো বলেন, ‘উভয় পক্ষের উচিত কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত এই ইতিবাচক গতি বজায় রাখতে একসাথে কাজ করা।’

সূত্র : বিবিসি