ইরান যুদ্ধ আর আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপাকে হোয়াইট হাউস

ইরান যুদ্ধ ও বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ৩৪%-এ, যা তার জন্য বড় ধাক্কা। জ্বালানি সঙ্কট ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে সাধারণ মার্কিন ভোটাররা ক্রমেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
হোয়াইট হাউস
হোয়াইট হাউস |সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তার জনসমর্থন এবারই সবচেয়ে নিচে নেমেছে। রয়টার্স ও ইপসোসের করা নতুন এক জরিপে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট, যা গত ১৫ থেকে ২০ এপ্রিলের জরিপে ছিল ৩৬ শতাংশ।

মূলত ইরানের সাথে জনপ্রিয়তাহীন যুদ্ধ এবং পরিণামে অসহনীয় হয়ে ওঠা জীবনযাত্রার ব্যয় মার্কিন সাধারণ মানুষকে ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। গত সোমবার শেষ হওয়া চার দিনের এই জরিপটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল যখন মার্কিনবাসীরা তাদের দৈনন্দিন খরচ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এই খবরটি প্রকাশ করেছে।

জরিপের বেশিভাগ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে গত শনিবার রাতে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ডিনারে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ গোলাগুলির আগে। সেই রাতে ট্রাম্পের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। এক বন্দুকধারী অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়।

ফেডারেল প্রসিকিউটররা ওই বন্দুকধারীর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। এই ঘটনার পর ট্রাম্পের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বা দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বর্তমান চিত্র বলছে, ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে যেখানে ৪৭ শতাংশ মানুষের সমর্থন তার সাথে ছিল, সেখান থেকে গ্রাফটা এখন শুধুই নিচের দিকে নামছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে এক তরফা যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামতে শুরু করে। এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের পকেটে, বিশেষ করে গ্যাসোলিন বা জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ ভরসা রাখতে পারছেন, যা আগের জরিপের তুলনায় আরো তিন শতাংশ কমেছে। যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মার্কিনীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক হামলার পর থেকে দেশটিতে গ্যাসোলিনের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। বর্তমানে এক গ্যালন তেলের জন্য মানুষকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪.১৮ ডলার। ওই হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পারস্য উপসাগরের তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের এই অগ্নিমূল্য মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর বিশাল চাপের সৃষ্টি করেছে।

এই পরিস্থিতি কেবল সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে না, বরং ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে দলের ভেতরেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, রিপাবলিকান দলের ভেতর ট্রাম্পের সমর্থন এখনো বেশ শক্ত, প্রায় ৭৮ শতাংশ দলীয় কর্মী তার পাশে আছেন। কিন্তু মুদ্রার উল্টা পিঠ হলো, তাদের মধ্যে ৪১ শতাংশই আবার জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ব্যর্থতায় বিরক্ত। অন্যদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে যারা তুরুপের তাস হতে পারেন সেই স্বতন্ত্র ভোটাররা এখন ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে আছেন।

জরিপ অনুযায়ী, এই দলছুট ভোটারদের ৩৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং মাত্র ২০ শতাংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন দিচ্ছেন। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন এখনো ঠিক করতে পারেননি তারা কাকে ভোট দেবেন।

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত চলতি মাসের শুরুর দিকে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা শান্ত হলেও সমস্যার সমাধান এখনো অনেক দূরে। ইরানের হুমকির কারণে পারস্য উপসাগর থেকে তেলের জাহাজগুলো ঠিকমতো বের হতে পারছে না। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যে এই যুদ্ধ মোটেও পছন্দ করছে না তা জরিপের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ৩৪ শতাংশ মানুষ ইরানের সাথে এই যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা গত মার্চে ছিল ৩৮ শতাংশ। দেশজুড়ে ১ হাজার ২৬৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর চালানো এই জরিপটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা দিচ্ছে।