বিমান দুর্ঘটনার ৩০ বছর পর রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের

রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে দুটি বিমান ভূপাতিত ও চারজনকে হত্যার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কিউবা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন দাবি করে আত্মসমর্পণ না করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
১৯৯৬ সালের বিমান দুর্ঘটনার সময় কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন রাউল কাস্ত্রো
১৯৯৬ সালের বিমান দুর্ঘটনার সময় কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন রাউল কাস্ত্রো |সংগৃহীত

কিউবা ও ফ্লোরিডার মধ্যবর্তী স্থানে ১৯৯৬ সালে দু’টি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বুধবার জনসমক্ষে আসা এই মামলাটিতে কাস্ত্রো এবং আরো পাঁচজনের বিরুদ্ধে তিনজন আমেরিকানসহ চারজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

একইসাথে কিউবান-আমেরিকান গ্রুপ ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউয়ের মালিকানাধীন দু’টি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

রাউল কাস্ত্রো ওই সময় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন। বিমান দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিকভাবে তাকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিলে। এখন তার বয়স প্রায় ৯৫ বছর।

যেহেতু কিউবার কমিউনিস্ট শাসনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাই দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল এই অভিযোগগুলোকে ‘আইনি ভিত্তিহীন একটি রাজনৈতিক চাল’ বলে দাবি করেছেন।

মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে বক্তব্য দেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংস এবং আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও মানুয়েল দে লা পেনিয়া ও পাবলো মোরালেসের মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক চারটি হত্যার অভিযোগও আনবে।

ব্ল্যাঞ্চে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের নাগরিকদের ভুলে যাননি এবং কখনো ভুলবেনও না।’

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে হবে। যার মধ্যে কিছু অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

হত্যার প্রতিটি অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের আনা নতুন এই অভিযোগগুলো এমন এক সময় কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বের একজন প্রধান ব্যক্তিত্বকে নিশানা করেছে, যখন কিউবা তার একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপের মুখোমুখি হচ্ছে।

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকার রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লিওগ্রান্ড বলেন, ‘আমি মনে করি কৌশলটি হলো চাপ প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে কিউবার সরকার নতি স্বীকার করে এবং আলোচনার টেবিলে আত্মসমর্পণ করে।’

যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং দেশটিতে তেল সরবরাহের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।

এর ফলে সেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

এর আগে বুধবার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার স্বাধীনতা দিবসের সাথে মিলিয়ে সেদেশের জনগণের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দেন।

রুবিও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র এবং একটি নতুন কিউবার মধ্যে সম্পর্কের একটি নতুন পথের প্রস্তাব দিচ্ছেন।’

এই দ্বীপরাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে রুবিও বলেন, জিএইএসএ নামে পরিচিত কিউবান সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি বড় গোষ্ঠী, যারা জিএইএসএ নামে পরিচিতি, তারাই প্রধানত এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং খাদ্য সঙ্কটের জন্য দায়ী, যা কি না দেশটির মানুষ ক্রমাগত সহ্য করে আসছে।

বন্দর থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্প এমনকি ফাইভ-স্টার হোটেল পর্যন্ত কিউবার অর্থনীতির বেশিভাগ লাভজনক অংশের মালিকানা বা পরিচালনায় রয়েছে এই জিএইএসএ।

রুবিওর এই বার্তার প্রতিক্রিয়ায় কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং কিউবার জনগণের ওপর কালেক্টিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ এনেছেন।

কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গঠনকে ‘কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের মতো বোকামিকে ন্যায়সংগত করার’ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন দিয়াজ-কানেল।

একইসাথে, বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃত করার অভিযোগও করেছেন তিনি।

তিনি দাবি করেন, কিউবা ‘তাদের নিজস্ব পানিসীমায় বৈধ আত্মরক্ষার্থে’ এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।

কাস্ত্রোকে বিচারের মুখোমুখি করতে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ব্ল্যাঞ্চে জানান, তার বিরুদ্ধে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোকে ধরে আনার চেষ্টা করবে কি না সেটি নিশ্চিত করেননি তিনি।

তবে ব্ল্যাঞ্চে বলেন, ‘আমরা আশা করি তিনি এখানে নিজের ইচ্ছায় হোক বা অন্য কোনো উপায়ে হোক হাজির হবেন।’

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ লিওগ্রান্ড বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ‘যদি কিউবানরা আলোচনার টেবিলে আত্মসমর্পণ না করে’ তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাবেক এই নেতাকে ধরে আনতে প্রস্তুত।

জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অভিযুক্ত করার পর, তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে আসার জন্য একটি সামরিক অভিযান চালায়।

এটি ওয়াশিংটনের সাথে ভেনিজুয়েলার সম্পর্ককে বদলে দিয়েছিল।

তবে লিওগ্রান্ড সতর্ক করে বলেন, কিউবার ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম, কারণ কাস্ত্রো প্রায় এক দশক আগে অবসর নিয়েছেন।

পরলোকগত কিউবান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই, প্রায় ৯৫ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো দেশটিতে এখনো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে তিনি ‘কিউবান বিপ্লবের জীবিত নেতা’ হিসেবে স্বীকৃত।

ক্যাস্ত্রো সরকার ও দলের সক্রিয় ভূমিকা থেকে সরে এসেছেন।

তবে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্সিয়াল সময়ে তিনি এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্বল্পস্থায়ী উন্নতি করেছিলেন।

এদিকে, রাউল কাস্ত্রোর মামলার সাথে মাদুরোর মামলার ‘তুলনা করবেন না’ বলে মন্তব্য করেন ব্ল্যাঞ্চে।

বুধবারের এই অভিযোগ গঠনের রাজনৈতিক দিকটি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।

ট্রাম্প বলেন, ‘ওখানকার অনেক মানুষই আমার সাথে সম্পর্কিত এই অর্থে যে কিউবান-আমেরিকানদের সাথে আমার খুব চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। মানবিক কারণে, আমরা এখানে সাহায্য করতে এসেছি।’

লড়াই ছাড়া নতি স্বীকার করবে না কিউবা

মিয়ামির যে কেন্দ্রে মার্কিন কর্মকর্তারা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই কেন্দ্র কিউবান-আমেরিকান মানুষে কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল।

দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে যারা কিউবা সরকারের বিরোধিতা করে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তারাই এই সেন্টারে ছিলেন।

তাদের বেশিভাগই কিউবান নির্বাসিত সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।

মিয়ামির ওই অনুষ্ঠানের কেন্দ্রটিতে ১৯৯৬ সালের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত চারজনের ছবি ছিল।

ক্যাস্ত্রোর এই খবরটি শুনে অনেকে অত্যন্ত রোমাঞ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ইসেলা ফিতেরে বলেন, ‘সময় এসেছে, ওই হত্যাপ্রবণ শাসনের ৬৭ বছর কেটে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘রাউল কাস্ত্রো কেবল চারজন ব্যক্তিকেই হত্যা করেননি, বরং বহু বছর ধরে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছেন তিনি।’

তিনি বলেন, বিচারের জন্য এ সময় কখনোই খুব বেশি দেরি হয়ে যায় না এবং এই পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত আরেকজন মার্সিডিজ পুইদ-সোতোও ফিতেরের মতো কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি খুব খুশি। বিচার হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, পরিবারগুলো এই অধ্যায়টি বন্ধ করতে পারছে এবং আমরা কিউবানরাও।’

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক ফেলো রোক্সানা ভিজিল বলেন, ব্ল্যাঞ্চের ঘোষণার ওপর এখনো এই প্রশ্নটির উত্তর ঝুলে আছে যে, ‘ট্রাম্প প্রশাসন কি মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মতোই এই অভিযোগ গঠনকেও আইন প্রয়োগকারী পদক্ষেপের আড়ালে সামরিক অভিযান চালানোর যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করবে?’

ভিজিল উল্লেখ করেন, ‘কোনো যুদ্ধ ছাড়াই কিউবান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, এমন সম্ভাবনা কম। একইসাথে কিউবা সরকারের সাথে কাজ করার যে কোনো পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কিউবান প্রবাসীদের পক্ষে মেনে নেয়া খুব কঠিন হবে।’

রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গুইলারমো রদ্রিগেজসহ যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার প্রতিনিধিরা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ‘আলোচনা’ করেছেন।

কিন্তু এই যোগাযোগ যে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনা মার্কিন এই অভিযোগগুলোকে সহজ করবে এমন সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে, মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে কিউবার পক্ষ থেকে ‘কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কোনো ছাড় নয়’- এমন অবস্থানে আরো অনড় থাকার লক্ষণ দেখা গেছে।

কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো একে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছে।

সূত্র : বিবিসি