কে হচ্ছেন পরবর্তী জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব?

একজন দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মহাসচিব বেছে নেয়ার পেছনে কয়েকটি বড় সমীকরণ কাজ করে। অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী মহাসচিব পদে বিভিন্ন অঞ্চলের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সুযোগ পাওয়ার কথা, সেই হিসেবে এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দাবিকে জোরালো হিসেবে ধরা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাতিসঙ্ঘ ভবন
জাতিসঙ্ঘ ভবন |সংগৃহীত

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অথচ জটিল এক পদের নেতৃত্ব বদলের সময় ঘনিয়ে এসেছে। যিনি এই পদে বসেন, তার কাছে কোনো সেনাবাহিনী থাকে না। নির্দিষ্ট কোনো দেশ চালানোর ক্ষমতা নেই। আর কোনো সরকারকে জোড়জবরদস্তি সিদ্ধান্ত মানাতে পারেন না। তবুও জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে অপরিসীম গুরুত্ববহ। পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রধান অ্যান্টনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। পরদিনই বৈশ্বিক এই সংস্থায় দায়িত্ব নেবেন ১০ম প্রধান। তবে এমন এক সময়ে এই রদবদল ঘটতে যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি এবং খোদ জাতিসঙ্ঘের অস্তিত্ব মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব

অ্যান্টনিও গুতেরেস

আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ‘মিডলইস্ট আই’-এর সংবাদ সম্পাদক লন্ডন থেকে সান্দোস আসেম জানান, জাতিসঙ্ঘের চার্টার বা সনদ অনুযায়ী মহাসচিব মূলত একাধারে প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সংকট সমাধানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোনো পরাশক্তি নয় বরং নিরপেক্ষ বা ছোট দেশগুলো থেকেই এই পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী বেছে নেয়া হয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রথম প্রধান নরওয়ের ট্রাইগভে লি থেকে শুরু করে দাগ হ্যামারশোল্ড পদটিকে কূটনীতির এক বড় অস্ত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। হ্যামারশোল্ড কঙ্গো সংকট সমাধানে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এবং শান্তিতে নোবেল পান। পরবর্তীতে উ থ্যান্ট, কার্ট ওয়াল্ডহাইম, হাভিয়ার পেরেজ দে কুয়েলার, বুত্রোস বুত্রোস-ঘালি, কফি আনান এবং বান কি-মুন এই ধারাই বজায় রাখেন। আশির দশকে পেরুর দে কুয়েলার ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

UN-Seey-Generals-Candidates

বাম দিক থেকে প্রার্থীরা হলেন: মিশেল ব্যাচেলেট, মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা, রাফায়েল গ্রোসি, রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট এবং ম্যাকি সাল

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলোতে বরাবরই জাতিসঙ্ঘকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটে মিসরের ভূখণ্ডে আক্রমণ থামানো কিংবা ১৯৮৭-৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সংস্থাটি কাজ করেছে।জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইরাক তড়িঘড়ি সম্মত হয়েছিল। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায় ইরান সময় নিয়েছিল। অবশ্য এ বিষয়টি পরে কুয়েলারের দক্ষতায় সুরাহা হয়। তবে সম্প্রতি গাজা সংকট থামানোর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ চরম সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। মহাসচিব গুতেরেস সনদ অনুযায়ী নিজের অর্পিত বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্ব শান্তির হুমকি হিসেবে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে কার্যকর পদক্ষেপ আটকে যায়। এমনকি ইসরাইলের পক্ষ থেকে মহাসচিব গুতেরেসের পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়।

একজন দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মহাসচিব বেছে নেয়ার পেছনে কয়েকটি বড় সমীকরণ কাজ করে। অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী মহাসচিব পদে বিভিন্ন অঞ্চলের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সুযোগ পাওয়ার কথা, সেই হিসেবে এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দাবিকে জোরালো হিসেবে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের ভি-৫ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব কোনো নাগরিক এ পদের প্রার্থী হতে পারেন না। সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, প্রার্থীকে ভেটো ক্ষমতাধর এই ৫ স্থায়ী সদস্যেরই অনুমোদন পেতে হয়। কেউ ভি-৫ ভুক্ত দেশের রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইলে তাকে ভেটো দিয়ে আটকে দেয়া হয়। অতীতেও এমনটি ঘটেছে।

এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ছয়জন চূড়ান্ত দৌড়ে আছেন, যার মধ্যে চিলির মিশেল ব্যাচেলেট, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট এবং সেনেগালের ম্যাকি সাল অন্যতম। তাদের মধ্যে চারজনই নারী। যা দীর্ঘ ৮১ বছরের ইতিহাসে এক নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের গোপন ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠানো হবে এবং সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করা হবে।

যিনিই নতুন মহাসচিব হয়ে আসুন না কেন, তাকে অত্যন্ত ভঙ্গুর এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভার নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্বব্যবস্থা ও জাতিসঙ্ঘের রূপরেখা তৈরি করেছিল, আজ তাদের নীতিতেই সংস্থাটি চরম আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে। বিশাল অঙ্কের চাঁদা বকেয়া রাখায় জাতিসঙ্ঘেকে ১৫ শতাংশের বেশি বাজেট কাটছাঁট করতে হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক আইন তোয়াক্কা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সাথে জোট বেঁধে যুদ্ধ উস্কে দিচ্ছে। ইরানের প্রতি একতরফা আগ্রাসী মনোভাব বজায় রাখছে। এ অবস্থায় নতুন মহাসচিবের জন্য শান্তির পতাকা তুলে ধরা কতটা কঠিন হবে তা সময় বলে দেবে।