মডেল মেঘনা আলমকে ঢাকায় তার বাসা থেকে পুলিশ আটক করার দু’দিন পর আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালত তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) রাতে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত এ আদেশ দেন। তবে আটকের ঘটনা ঘটে গত সোমবার।
অন্যদিকে, আটকের ঘটনার তিন দিন পর শুক্রবার (১১ এপ্রিল) পুলিশ জানিয়েছে, এই নারীকে সুনির্দিষ্ট কারণে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ রাখা হয়েছে।
গত সোমবার রাতে পুলিশ যখন তাকে আটক করতে যায়, সে সময় তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লাইভ করেন। সেই লাইভে তিনি বলছিলেন, তার দরজার বাইরে পুলিশ পরিচয়ধারীরা তাকে নিতে এসেছে।
মেঘনা আলমের ফেসবুক লাইভ চলার সময়ই তার বাসায় পুলিশ প্রবেশ করে এবং তখন লাইভ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১২ মিনিট ধরে চলা ফেসবুক লাইভ পরে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও সরে যায়।
কিন্তু ১২ মিনিটের ফেসবুক লাইভ ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই সেটি ডাউনলোড করে পুনরায় পোস্ট করে।
আটক হওয়ার আগমুহুর্তে সেই লাইভে তিনি শুরুতেই বলছিলেন, তার বাসায় ‘কিছু মানুষ আক্রমণ করেছে। তারা নিজেদেরকে পুলিশ পরিচয় দিচ্ছে। আমি বলেছি থানায় এসে কথা বলব, তারা কথা শুনছে না।’
লাইভের ভিডিও-তে মেঘনা আলমকে দরজার বাইরে থাকা লোকেদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা আমার দরজার ভাঙ্গার চেষ্টা করছেন। আমার ভয় পাওয়া তো স্বাভাবিক.... না?’
ওই ভিডিও-তে কথোপকথনে শোনা যায়, মেঘনা আলমকে আটক করতে সাত-আটজন ‘পুলিশ পরিচয়ধারী’ এসেছে এবং তাদের হাতে বন্দুক ছিল।
মেঘলা আলম ওই ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা যার কথায় এখানে এসেছেন... তাকে কখনো আমি আমার বাসায় ঢুকতে দেইনি। আপনার তো আমাকে ফোন করে আসার কথা।’
এই নারীর দাবি, বাংলাদেশে নিযুক্ত একজন বিদেশী রাষ্ট্রদূতের কথায় ‘পুলিশ’ তার বাসায় এসেছে এবং একপর্যায়ে ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘তাকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
দরজার ওপাশ থেকে তাকে দরজা খুলতে বলা হলে মেঘনা আলম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তাকে ‘কারণ (দরজা খোলার) বলতে হবে। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট থাকতে হবে।’
ফেসবুকে লাইভ করার সমই মেঘনা আলম তার আইনজীবীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং ঘটনা জানান।
এ সময় তাকে জরুরি সেবা নম্বরে কল দিয়েও সাহায্য চাইতে শোনা যায়।
যখন মেঘনা আলম ফোনে কথা বলছিলেন, তখন বাইরে থাকা লোকজন তার বাসার দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করে। লাইভের শেষ কয়েক সেকেন্ডে মেঘনা আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার ফোন, ল্যাপটপ সব নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে...আপনি টানাটানি করছেন কেন!’
তখন ফেসবুক লাইভ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাকে নিয়ে কি ঘটল, সে ব্যাপারে প্রায় ২৪ ঘণ্টা কোথাও থেকে কোনো তথ্য আসেনি।
অবশেষে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পুলিশের বরাতে গণমাধ্যমে খবর আসে যে, আটকের দু’দিন পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ। আদালত তার বিরুদ্ধে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠায়।
শেষপর্যন্ত শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ বা ডিএমপি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ভেরিফায়েড অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানায় যে, অপহরণের এই অভিযোগ সত্য নয়। বরং ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্ক মিথ্যাচার ছড়ানোর মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অবনতির অপচেষ্টা করা এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে সকল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।’
কিন্তু মেঘনা আলম কী ধরনের ষড়যন্ত্রে করেছে এবং সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কে? ডিএমপির তরফ থেকে দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে সে বিষয়ে খোলাসা করে কিছু বলা হয়নি।
পরে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার তালেবুর রহমানের কাছে এটি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এর উত্তর তার জানা নেই।’
বিশেষ ক্ষমতা আইন কী?
‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ বা ডিটেনশন আইন প্রয়োগ করে সরকার কোনো ব্যক্তিকে আদালতের আনুষ্ঠানিক বিচার ছাড়াই জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সন্দেহভাজন হিসাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক বা বন্দি করতে পারে।
তবে, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং তাকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ জানাতে হবে, এ তথ্য জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
‘তবে একজন নারীকে ধরার জন্য রাতের বেলা অর্ডার দিচ্ছে, বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। তার থেকে বড় কথা, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এটি করতে পারবে। ম্যাজিস্ট্রেটের কথা আইনে বলা নাই। তাহলে সিএমএম কোর্ট এটি কিভাবে করলো?’ প্রশ্ন ওই আইনজীবীর।
তিনি বলেন, ‘আইনে সিএমএম কোর্টের এই অনুমতি দেয়ার কোনো সুযোগ নাই।’
ইশরাত হাসান বলেন, ‘আইন ব্যত্যয় করে যদি কাউকে অ্যারেস্ট করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।’
‘বিস্তারিত অর্ডারে যদি দেখা যায় যে আইন বহির্ভূতভাবে তারা এটা করছে, তাহলে ইমিডিয়েটলি তাকে রিলিজ করা উচিৎ। দ্বিতীয়ত, অবৈধ ডিটেনশনের জন্য জড়িতদের তখন আইন বহির্ভূতভাবে একজনকে ধরায় প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্টের আওতায় আনা উচিৎ’ বলে মন্তব্য করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান।
তার মতে, মামলা থাকাবস্থায় কাউকে গ্রেফতার করা এবং মামলা নাই-এমন কাউকে গ্রেফতার করা আলাদা বিষয়। ‘এখানে স্পষ্টভাবে বলা নেই যে উনি দেশের বিরুদ্ধে কী করছেন। এগুলোর মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে আনতে হবে যে, কেন দেশের জন্য এত হুমকিস্বরূপ হয়ে গেল-একটি অনেক বড় বিষয়।’
ডিএমপির দেয়া বিবৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই জিনিসটা হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটলে এটার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। এটা নিয়ে কোনো লুকোচুরি করা যাবে না। এই বিবৃতি পর্যাপ্ত না... প্রিডিটেনশনের সময় বলছেন যে বাংলাদশের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরে অন্য কোনো মামলা দিয়ে দিলে তো হবে না।’
এই আইনজীবী বলেন, ‘মেঘনা আলমকে আটকের সময় নারী কনস্টেবল ছিল না বা তাকে আটকের আগে তার মেডিক্যাল টেস্ট হয়েছে কিনা, এগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।’
এদিকে, বাংলাদেশে এই বিশেষ ক্ষমতা আইনকে ‘কালো আইন’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় এই আইনটি অপসারণের দাবি উঠলেও কোনো সরকারই তা করেনি।
কালো আইন বলার কারণ হিসেবে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেছেন, ‘এই আইনের অনেক অপপ্রয়োগ হয়। এই আইন বিচারবহির্ভূতভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে থাকে। এটি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার’-এর পরিপন্থী।’
এই আইনে রাষ্ট্র-বিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষা বিরোধী কার্যকলাপ, বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষতি সাধন, জননিরাপত্তাবিরোধী কাজ করা, জনসাধারণের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা-সহ নানা বিষয়।
এছাড়াও, জনগণের মধ্যে বা জনগোষ্ঠীর কোনো অংশের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা, দেশের আইন ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাধা দেয়া এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
মূলত, পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইন ১৯৫২, জননিরাপত্তা অর্ডিন্যান্স ১৯৫৮ এবং ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ তফসিলি অপরাধ (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশকে প্রতিস্থাপনের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এই আইনটি পাস করা হয়েছিল।
এর উদ্দেশ্য ছিল, বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু কার্যকলাপ প্রতিহত করা। একইসাথে কিছু গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।
সূত্র : বিবিসি



