তুলা উৎপাদন বাড়াতে ২০ কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার

দেশে পাট চাষের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পর তুলা এখন অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
তুলা
তুলা |ইন্টারনেট

দেশে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তুলা চাষিদের জন্য ২০ কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্দ করেছে সরকার।

এ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ ড. মো: গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, ‘দেশে তুলার উৎপাদন বাড়াতে এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিতে টানা তৃতীয়বারের মতো এই প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।’

এই কর্মসূচির আওতায় ২৬টি জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষক এক বিঘা জমিতে সাথি ফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কীটনাশক পাবেন।

মূলত এই প্রণোদনা কৃষকদের তুলা চাষে উৎসাহিত করবে এবং এই অর্থকরী ফসলের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করবে বলে জানিয়েছেন সিডিবি’র এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, দেশে পাট চাষের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পর তুলা এখন অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে তুলার চেয়ে বেশি লাভজনক আর কোনো ফসল নেই। তাই কৃষকদের তুলা উৎপাদনে উৎসাহিত করলে তারা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তেমনি কাঁচা তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমবে।’

তুলা উৎপাদনের আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে জানতে সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো: রেজাউল আমিনের সাথে কথা হয় বাসসের। তিনি বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে ১৫ মণ (প্রতি মণ ৩৭.৩২ কেজি) কাঁচা তুলা উৎপাদন করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।

তিনি আরো জানান, সাধারণত জুনের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়। ফলে প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের বিপরীতে কৃষকরা সরকারের প্রায় চার মার্কিন ডলার আমদানি খরচ সাশ্রয় করছেন।

তুলা চাষে প্রণোদনা উদ্যোগ প্রসঙ্গে সিডিবি’র সিনিয়র জিনিং অফিসার কৃষিবিদ মুহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কারণ এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অন্যদিকে, একই জমিতে পরপর তিনবার ভুট্টা চাষ করলে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

তিনি বলেন, এই প্রণোদনার আওতায় প্রত্যেক কৃষক এক বিঘা জমিতে তুলা চাষের জন্য আট হাজার টাকা মূল্যের কৃষি উপকরণ পাবেন। এর মধ্যে থাকবে ছয় শ’ গ্রাম হাইব্রিড তুলার বীজ; ৫০ কেজি করে টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সার; দুই কেজি অণুখাদ্য বোরন সার; ৪৫০ মিলিলিটার ছত্রাকনাশক এবং ১৫০ মিলিলিটার উদ্ভিদের বৃদ্ধিকারক।

প্রণোদনা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জোনভিত্তিক বিভাজনে দেখা যায়, যশোর জোনে তিন হাজার; চুয়াডাঙ্গায় সাড়ে পাঁচ হাজার; ঝিনাইদহে তিন হাজার ২০০; কুষ্টিয়ায় ছয় হাজার ২০০; রাজশাহীতে দুই হাজার; বগুড়ায় এক হাজার ২০০; ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০০; রংপুরে ৬৮০; ময়মনসিংহে এক হাজার ২০০ এবং ঢাকা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জোনের প্রতিটিতে ৩৮০ জন করে কৃষক এই প্রণোদনা সুবিধা পাবেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে এই তহবিল হস্তান্তর করবে এবং আগামী মাস থেকে জেলা পর্যায়ে প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তার (সিসিডিও) সমন্বয়ে এসব কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হবে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ১২ হাজার ৩৭৫ জন প্রান্তিক কৃষককে তুলা চাষের জন্য প্রণোদনা হিসেবে নয় কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ হাজার ১০০ জন কৃষকের তুলা উৎপাদনের জন্য ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল।

এদিকে, অধিক ফলন নিশ্চিত করতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) তুলার জাত প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞানীরা।

তাছাড়া, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিস্থিতি তুলা চাষের জন্য এক অনন্য সুবিধা প্রদান করে। দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও মধ্যাঞ্চল মিলিয়ে ৩২টিরও বেশি জেলা জুড়ে বিস্তৃত উঁচু ও পাহাড়ি উভয় প্রকার ভূমি তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়, যেখান থেকে বার্ষিক প্রায় দুই লাখ এক হাজার ২৭২ বেল তুলা উৎপাদিত হয়।

তবে স্থানীয় এই উৎপাদন জাতীয় চাহিদার মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ পূরণ করতে পারে। দেশের শক্তিশালী টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্পের কারণে তুলার এই বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, যার জন্য প্রতি বছর আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন হয়।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা আমদানির পেছনে সরকারকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা আমদানির পেছনে সরকারকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল।

সূত্র : বাসস