ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম নিরসনে পঞ্চম ধাপ দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি

ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট আয়োজিত এক সভায় বক্তারা এ দাবি জানান।

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল

বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও -এর সমন্বয়ে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৫.৪ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১২.৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ প্রতি ৩ জন শিশু শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ জন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত—যা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য কষ্টকর ও অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই কারণে অনেক শিশুরা অপরাধ জগতের সাথেও জড়িয়ে পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে “ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম নির্মূল প্রকল্প”-এর পঞ্চম ধাপ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাটির আয়োজন করে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াইডাবলুডিআরসি) এবং এতে সহযোগিতা প্রদান করে নারী উন্নয়ন শক্তি (এনইউএস), বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (টিজিডাবলুএফ), ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিডাবলুইএ), শি-লিড এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (এফসিএইচডি)।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেটের এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হবে।

নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন তার প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়া এই সমস্যা নিরসন কিছুতেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য ড. সুলতান মোহাম্মদ রাজ্জাক বলেন, প্রচলিত আইনের বাস্তব বানানোর ক্ষেত্রে দুর্বলতা দূর করে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী সদস্য আব্দুল মমিন বলেন, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে টেকসই সমাধান।

ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার ফাউন্ডেশনের প্রচার সম্পাদক সেলিনা খাতুন বলেন, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার ফলে শিশুশ্রম আরো বহু গুণ বেড়ে গেছে যা বিগত জরিপের তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, সিলিড এর নির্বাহী সদস্য সাহিদা ওয়াহাব, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি, লেবার লিডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনসহ আরো অনেকে।

সভায় বক্তারা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধে সরকারের পূর্ববর্তী উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। তাই অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

সরকারের প্রতি সভার প্রধান দাবিসমূহ:

১. ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম নির্মূল প্রকল্পের পঞ্চম ধাপ দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

২. ঝুঁকিপূর্ণ খাতে নিয়োজিত শিশুদের দ্রুত সনাক্ত করে পুনর্বাসন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা।

৩. শিশু শ্রম নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।

৪. শ্রম আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৫. দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা, যাতে শিশুরা শ্রমে না গিয়ে শিক্ষায় ফিরে যেতে পারে।

৬. স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।

সভায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম নির্মূলে দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।