ঐতিহাসিক পলাশী দিবসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আধিপত্যবাদ ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত রুখে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ’।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘প্রায় ২৭০ বছর আগের পলাশীর ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি আজও আমাদের দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পলাশী কেবল ভাগীরথী নদীর তীরেই সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমান বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বুড়িগঙ্গার তীরেও একই ধরনের চক্রান্ত সচল রয়েছে। নব্য সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের রূপ এখন বদলেছে—এখন তারা সরাসরি ভূখণ্ড দখল করে না, বরং দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিকে পর্দার আড়াল থেকে নিজেদের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও মীর জাফর ও ঘসেটি বেগমদের মতো চরিত্রের অভাব নেই, যারা বিদেশী প্রভুর সেবাদাসত্ব করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দিল্লির আধিপত্যের চরণে সমর্পণ করতে ব্যস্ত।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিলের উক্তি টেনে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’। দেশের মানচিত্র ও পতাকা আলাদা হলেও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজ অরক্ষিত ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের আদর্শিক দীনতা। ক্ষমতার লোভে এবং নব্য আধিপত্যবাদীদের খুশি করতে দেশের প্রথম সারির দলের জনপ্রতিনিধিরাও সংসদে দাঁড়িয়ে ১৯৪৭ সালের ভূখণ্ডগত সীমানা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি তুলে দেয়ার বা অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘১৯৪৭-এর পৃথক জাতিসত্তার সীমানা সৃষ্টি না হলে ১৯৭১-এর সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা অর্জন করা সম্ভব হতো না। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান বাংলাদেশে এই অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং গোলামীর মানসিকতা রুখে দিতে প্রতিটি নাগরিকের মাঝে প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্বকীয় মূল্যবোধের চেতনা জাগ্রত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।’
বিশেষ অতিথির আলোচনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক বেলাল হোসেন বলেন, ‘১৭৫৭ সালের পরে প্রায় ১৫০ বছর পরে এসে মুসলমানরা একটি রাজনৈতিক সংগঠন পেয়েছে। যে সংগঠনের উপর দাঁড়িয়ে তাদের দাবি রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা যায়। রাষ্ট্র, রাষ্ট্র পরিচালনা, শাসন এগুলো সামাজিক বিষয় না। এটা রাজনৈতিক বিষয়। সে রাজনীতি থেকে হারিয়ে গিয়ে আবার মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তারা রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। এবং যেই মুসলিম লীগের হাত ধরে আমরা দেখি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর দীর্ঘ প্রায় ১৫০০ বছরে মুসলমানরা সবচাইতে ভালনারেবল টাইম পার করেছে গত ১০০ বছর। সবচাইতে কষ্টকর, বেদনাদায়ক সময় পার করেছে। উসমানী খেলাফতের পতনের পর এবং এই কঠিন সময়ের মধ্যে মুসলমানদের যদি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য থেকে থাকে, সেটি হচ্ছে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান রাষ্ট্র। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য, মুসলমানদের জন্য, যেখানে ভারতবর্ষে হিন্দু মেজরিটি, সেখানে মুসলিম লিডারশিপ তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নেগোসিয়েশনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র পেয়েছে। এটি মুসলমানদের জন্য অনেক বড় অর্জন ছিল পুরো ১০০ বছরের মধ্যে।’
‘আর সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সীমানাটা আজকে দুটি রাষ্ট্র, একটি বাংলাদেশ আরেকটি পাকিস্তান। আমি বিশ্বাস করি, এই দুই দেশের মানুষ যদি তাদের হারানো ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবং মুসলমানদের যে গ্লোরিয়াস পিরিয়ড, যে গোল্ডেন এইজ মুসলমানদের ছিল, সেগুলোকে যদি আবার ধারণ করে, তাহলে আবারো পৃথিবীর বুকে মুসলমানরা শ্রেষ্ঠত্ব অধিকার করবে এবং তাদের অবস্থান তারা নিশ্চিত করতে পারবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি সুভ্যেনিরটা দেখতেছিলাম, যে সুভ্যেনিরে দেখেছি ছাত্রশিবির তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে কন্টিনিউ এই পলাশী দিবসের প্রোগ্রামটি করে যাচ্ছে। এই পলাশী দিবস আমাদেরকে বার্তা দেয়, আমরা আমাদের সম্পদ, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সেই গৌরব আমরা হারিয়েছি। আমাদেরকে আবার সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা যদি সেটা করতে পারি, তাহলে পরে এই সকল আলোচনা সভা সফল হবে এবং আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রশিবির এমন একটি জেনারেশন তৈরি করবে, যারা তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রাখবে এবং দেশের উন্নতি এবং সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।’
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। এটা এমনভাবেই তার জায়গা দখল করে নেয় এবং বারবার ঘসেটি বেগম ও রায় দুর্লভদের আবির্ভাব হয়, যারা এই দেশে খেয়ে, এই দেশে বড় হয়ে, এ দেশের জনগণের অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য করে আবার এই জনগণের উপরই তাদের বিরোধী সন্ধি চাপিয়ে দিয়ে জনগণকে শত শত বছরের জন্য বারবার পরাধীন করে রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৪৮-৪৯ সালের ঠিক এই দিনে (২৩ জুন) একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল—আওয়ামী লীগ। এর জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা না, এর জন্মটাই হয়েছে এই বাংলাদেশকে পরাধীন করে রাখার জন্য এবং যার নজরানা তারা দিয়েছে যখন এদেশের জনগণ পূর্ববর্তী সময়ের মতো তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা যাদের আধিপত্যকে এই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করেছিল, সে আধিপত্যবাদীদের কাছে গিয়েই আবার তারা আশ্রয় গ্রহণ করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের নেচার ও ফিচার যদি হাজার বছরের ইতিহাস আপনারা দেখেন, আপনারা দেখবেন এই অঞ্চলে মৌর্যরা যখন শাসন করত, এরপরে এই অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে গুপ্তদের শাসন এসেছিল, পালদের শাসন এসেছিল, সেনদের শাসন এসেছিল। মুসলিম সালতানাত এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীন সুলতানি আমল ছিল প্রায় ৬০০ বছর ধরে। মুসলমানরা যখন এখানে শাসন করেছিল—হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তাদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে এই অঞ্চলে বসবাস করেছিল। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কারণে এই অঞ্চলে মুসলমানরা শত শত বছর শাসন করার পরেও হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের দাঙ্গা হতো না।’
শিবির সভাপতি বলেন, ‘এ অঞ্চলে প্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন তাদের বাণিজ্য প্রসার করার জন্য এসেছিল, ১৬৩৪ সালে এখানে এসে প্রথম কুঠি স্থাপন করল কাসিম বাজারে। এরপর থেকেই শুরু। কাসিম বাজারে তারা যে কয়জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিল, তার সকল কর্মচারী তারা হিন্দু নিয়োগ দিয়েছিল। যার ফলে এখানে একটি হিন্দু আঁতাত তারা গড়ে তুলেছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদেরকে মুসলমানদের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অনাস্থা নিয়ে এসে তলে তলে একটি বিভাজনের রাজনীতি এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৭৫৭ সালে এই অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে যে কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরাধীন করা হয়েছিল, তারা নবাবের একেবারেই কাছের ছিলেন। কেউ ছিলেন নবাবের সেনাপতি, কেউ ছিলেন তার অর্থমন্ত্রী, কেউ ছিলেন তার চাচি, কেউ ছিলেন তার পার্শ্ববর্তী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী। এই মানুষগুলোই—মীর জাফর, ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ—পরবর্তী সময়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল এবং বিপদের মুখে তাকে ফেলে দিয়ে ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেছিল শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষেরা বারবার পরাধীন হয়েছে, জীবন দিয়েছে। এরপরে বাংলার মানুষেরা স্বাধীনতা চেয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষে বিদ্রোহ করে বারবার, যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় তখন সে বিদ্রোহ করে বসে এবং শাসকগোষ্ঠী পালাতে বাধ্য হয়। মাঝে মাঝে তারা তাদের আধিপত্যবাদীদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ইতিহাস বলে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, এর পরবর্তী আমাদের জুলাই বিপ্লব শত শত হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে মানুষেরা এই বিপ্লব এনে দেয়।’
‘আর শাসক গোষ্ঠীর যারা বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে আলিশান জীবনযাপন করে, বিপ্লব-বিদ্রোহের পরেই তারা এসে আবার ক্ষমতা দখল করে। তারা চায় না এই রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার হোক, তারা চায় না খুন প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন হোক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতগুলোকে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে। ১০০ দিনের শাসনে ৬০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তার কোনো বিচার হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে অফিস খুলছে, মিছিল-মিটিং করছে।’
ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘পলাশীর এই আলোচনাগুলো ইসলামী ছাত্রশিবির তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারাগুলোকে জাতির সামনে, যুবকদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সৎ ও দক্ষ দেশপ্রেমিক নাগরিক আমরা তৈরি করতে চাই। আমরা এদেশে এমন কোনো মানুষ তৈরি করব না যারা এদেশে জন্ম নিয়ে এদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেয়। আমরা তাদের কাছে অনুরোধ জানাই—ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। নতুন বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আপনাদের কাছে আমরা আহ্বান জানাই।’
তিনি সকল খুন ও হত্যাযজ্ঞের বিচার অনতিবিলম্বে এ বাংলার মাটিতে কার্যকর করার অনুরোধ জানান।
অনুষ্ঠানে এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী, এমপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন এবং বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. সায়ীদ ওয়াকিল। আরো উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক আনিসুর রহমান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদিব মুসা প্রমুখ।



