বৈষম্যমুক্ত ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠা; সর্বোপরি খুন, গুম, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও আয়নাঘর থেকে মুক্তির জন্যই জুলাই এসেছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০, ফলপট্টি সংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর মিরপুর জোন আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দাবিতে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও ডিএনসিসিতে জামায়াত মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমানের পরিচালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক হারুন অর রশীদ খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা। বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, মহানগরী পশ্চিম শিবির সভাপতি মুহিবুল্লাহ আল হোসাইনি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি শান্ত তালুকদার, শহীদ মাহফুজুর রহমানের পিতা আব্দুল মান্নান, শহীদের পিতা মোশাররফ হোসেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দেশ ও জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা বুকিংয়ের পর অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল হতাশা। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তার রহমত থেকে হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। এরপরই জুলাই দেশ ও জাতির মুক্তির পয়গাম নিয়ে এসেছিল। মূলত, জুলাই এসেছিল ঘূর্ণিঝড় হয়ে। আর এ ঝড়েই ফ্যাসিবাদকে তছনছ করে তাসের ঘরের মতো উড়িয়ে দিয়েছিল।
তিনি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশ ছেড়ে পালানোর পর তিনি ‘এই আসলাম’ বলে এসেছেন প্রতিনিয়ত। এভাবে তিনি ১৩ বার ফেল করেছেন। তিনি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন, যুবসমাজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তারা ফাঁসির রশি নিয়ে প্রস্তুত আছে। তিনি জুলাই গণহত্যার বিচারে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার ও সংসদ জুলাই বিপ্লবের ফসল। তাই সরকারকে জুলাই বিপ্লবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। তিনি জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, শুধু বিচার নয়, বরং জুলাই যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করতে হবে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের সুচিকিৎসা এবং তারা যাতে সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকেই। জুলাই শহীদদের দিতে হবে জাতীয় বীরের মর্যাদা। তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কারণ, জুলাই যোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তিনি জুলাই শহীদদের নামে মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান, যাতে তাদের স্বজনরা তাদের জন্য গর্ববোধ করতে পারেন।
জামায়াত আমির বলেন, সরকার এখন গণভোটের রায়কে অবৈধ বলছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছেন। আমরাও করেছি। গণভোট অবৈধ হলে সরকার ও সংসদ সবই অবৈধ। গোশত হালাল হলেও ঝোল হারাম হওয়ার সুযোগ নেই। তাই গণভোট হারাম হলে সরকারও হারাম। আর সরকার হারাম হলে দেশে কোনো বৈধ সরকার নেই। তিনি জনগণের অভিপ্রায়ের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, জনগণের মতামতই সবার ওপরে। আর প্রয়োজনের তাগিদের ওপর কোনো আইন নেই। তিনি সরকারকে টালবাহানা পরিহার করে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। অন্যথায় এজন্য তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, গণরায়কে কোনোভাবেই পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই জুলাই চেতনায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি জুলাই সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ গ্রহণের কথা। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আর অপরটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে। এ পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু সরকার নানা ছলছুতোয় এবং সংবিধানের দোহাই দিয়ে তা পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে কথা বলেছেন। তাই জনগণ সরকারকে গণরায় পাশ কাটানোর সুযোগ দেবে না, বরং যেকোনো মূল্যে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করবে। তিনি সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। অন্যথায় সরকারকে এজন্য চরম মূল্য দিতে হবে।



