জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে সরকার ও বিরোধী দল এক সাথে কাজ করতে চায়। এ জন্য জাতীয় সংসদে ১০ সদস্য বিশিষ্ট বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি দলের পাঁচজন ও বিরোধী দলের পাঁচজনকে নিয়ে এ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদ কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯তম দিনে স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
অধিবেশনে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। আমরা সবাই আলোচনা করে একমত হয়েছিলাম, কারণ এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সারাবিশ্বে এ সমস্যার তার ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা উনার বক্তব্যে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা যৌক্তিক। তারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে সরকারি ও বিরোধী দল মিলে একসাথে কাজ করতে পারি। সেই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের স্বার্থে এই আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আমাদের পক্ষ থেকে একটি কমিটির প্রস্তাব করছি। আমরা পাঁচ সদস্যের নাম দিচ্ছি। বিরোধী দলকে অনুরোধ করব তারাও যদি পাঁচটি নাম দেয়, তাহলে এই ১০ জন সদস্য বসে আলোচনা করতে পারে। কোনো পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে সেটি সরকারের কাছেও আসবে। সরকার তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেবে। দেশের মানুষের স্বার্থে যেকোনো বিষয়ে, যে কারো সাথে আলোচনার পথ উন্মুক্ত থাকবে।
এই প্রস্তাবের পর টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান উপস্থিত সংসদ সদস্যরা। তখন প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কমিটির সুপারিশ যাতে বাস্তবায়নের মুখ দেখতে পারে, সেজন্য জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে সভাপতি করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানকে ফ্লোর দেন এবং মতামত জানতে চান স্পিকার। বিরোধীদলীয় নেতা তার প্রস্তাবকে সংসদ নেতা ইতিবাচকভাবে নেয়ায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা আশা করি এই সংসদ জাতীয় সকল সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে। তাদের পক্ষ থেকে শিগগিরই পাঁচজনের নাম দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
পরে স্পিকার বলেন, আশা করি, অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিরোধী দলের নেতা পাঁচজন সদস্যের নাম দেবেন। কারণ, এই সংসদ (চলতি অধিবেশন) এই মাসেই শেষ হবে। আপনাদের এই বক্তব্যের ফলে জনগণের মনে অনেক আশা সঞ্চার হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে যদি সহযোগিতার মাধ্যমে অগ্রসর হয়, তবে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত সরকারি দলের পাঁচ সদস্যের অন্যরা হলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সরকার দলীয় হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) এবং সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম খান শান্ত ও মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। এই কমিটি বিরোধী দলের সদস্যদের নাম পাওয়ার পর কাজ শুরু করবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে, বুধবার জাতীয় সংসদে ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ বিষয়ে একটি নোটিশ এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘কমন (যৌথ) কমিটি’ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানিয়েছিলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব বিবেচনায় নেবে সরকার। তাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে কিছু থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে। তারই ধারাবাহিকতায় সংসদ নেতা পাঁচ সদস্যের নাম ঘোষণা করেন এবং বিরোধী দলকে সমসংখ্যক সদস্য দিতে অনুরোধ জানান।
ঢাকায় লোডশেডিং
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, দেশের কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে এবং শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গ্রামের কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তারা যেন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ফসল কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী নিরবিচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনা সমুন্নত রাখতে রাজধানী ঢাকাতে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য এলে সেখানে বিশ্বাস অর্জন করতে দেশবাসীর কিছুটা সময় লাগবে। তবে বর্তমান সরকার তাদের শপথের মর্যাদা এবং পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানের এই বিদ্যুৎ সমস্যা এক দিনের নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল। বর্তমানে কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সাথে সেটির গড়মিল রয়েছে।
তিনি জানান, গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে দেশজুড়ে দুই হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে প্রতিদিন তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে দুই হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন এক হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না। তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দৃশ্যমান হবে।
তিনি জানান, একটি আমদানিকৃত পাওয়ার প্লান্ট এবং একটি কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বর্তমানে বন্ধ থাকায় সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এগুলো পূর্ণ উৎপাদনে ফিরলে আগামী সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। জনগণের এই সাময়িক কষ্টের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।



