মাদকাসক্তি মোকাবেলা এবং চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এতে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন ২০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ গোলাম আজম
ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ গোলাম আজম |সংগৃহীত

দেশে বাড়তে থাকা মাদকাসক্তি মোকাবেলা এবং চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করতে সরকার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে সাতটি সরকারি পুনর্বাসন হাসপাতাল স্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এতে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন ২০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ উদ্যোগটি ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রসহ বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়নের চলমান প্রচেষ্টারও পরিপূরক।

বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, ‘পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর নকশা চূড়ান্ত হলেই দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘যথাসময়ে অর্থ ছাড় হলে আগামী অর্থবছরেই নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।’

সাতটি বিভাগেই জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে তিনি জানান, এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩২ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে কাজ সম্পন্নের জন্য যথেষ্ট নয়।’

এ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে ৪২০ কোটি টাকার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আজম বলেন, স্থাপত্য অধিদফতর প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন করে তা গণপূর্ত অধিদফতরে পাঠিয়েছে, যেখানে কাঠামোগত নকশার কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ২০০ শয্যার হাসপাতাল ধাপে ধাপে কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে একসাথে প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ রোগীকে সেবা দিতে পারবে। প্রকল্পে প্রায় ১৪০ জন চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া হবে।’

চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এতে ওষুধের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা থাকবে, যা মাদকাসক্তিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে দেখার প্রতিফলন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিকল্পনা-২) আলীমুন রাজীব বলেন, ‘রাজশাহী শহরে ইতোমধ্যে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বাকি ছয়টি বিভাগীয় শহরে উপযুক্ত জায়গা খোঁজা হচ্ছে।’

তিনি জানান, রাজশাহীতে গণপূর্ত অধিদফতরের একটি প্লট নির্বাচন করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৪৪ কোটি টাকা।

ঢাকাকে এ প্রকল্পের বাইরে রাখা হয়েছে, কারণ রাজধানীর জন্য আলাদা একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

তবে প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে ৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যাতে সমন্বয় ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দেশে বর্তমানে ৪০২টি অনুমোদিত বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র কার্যক্রম চালাচ্ছে।

এ উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেয়া হয়েছে, যখন দেশে মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থাপিত এক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার চার দশমিক ৮৮ শতাংশ) এক বা একাধিক মাদক ব্যবহার করেন। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পান, ফলে ৮৭ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে থেকে যান।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় ৫,২৮০ জনের ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় পরিমাণগত ও গুণগত উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী জীবনের কোনো এক পর্যায়ে মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অধিকাংশই মানসম্মত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।

তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে—৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী আট থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেন।

বিভাগ ভিত্তিক হিসেবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী (২২ লাখ ৮৭ হাজার), এরপর চট্টগ্রাম (১৮ লাখ ৭৯ হাজার) ও রংপুর (১০ লাখ ৮০ হাজার), আর বরিশালে সবচেয়ে কম (চার লাখ চার হাজার)।

গাঁজা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক, যার ব্যবহারকারী প্রায় ৬১ লাখ। এরপর রয়েছে মেথামফেটামিন (ইয়াবা) প্রায় ২৩ লাখ এবং অ্যালকোহল প্রায় ২০ লাখ।

এছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন, যা তাদের এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের ঝুঁকিতে ফেলে।

গবেষকরা জানান, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহার বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বেকারত্ব, সহপাঠীর প্রভাব, আর্থিক অস্থিরতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং মানসিক চাপ মাদকাসক্তির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক সহজেই পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরবরাহ ও চাহিদা উভয় দিক নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ এবং তরুণদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলেন, সামাজিক কলঙ্ক ও সম্মানহানির ভয়ে অনেক পরিবারই চিকিৎসা নিতে এগিয়ে আসে না। বাসস