তরুণদের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধির আহ্বান

ডা: সাদিকুর রহমান ইফাত বলেন, কার্যকরভাবে তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হলে লাখো তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে এবং ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগ ও অকাল মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: সন্ধানীর বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন
‘তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: সন্ধানীর বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন |ছবি : নয়া দিগন্ত

তরুণদের তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ছাত্রসংগঠন সন্ধানী। সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেটের মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে। একইসাথে উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য যথাক্রমে ১৫০ টাকা ও ২০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত তরুণদের তামাক ব্যবহার শুরু নিরুৎসাহিত করতে ‘তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: সন্ধানীর বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের উপদেষ্টা ডা: হুমাইরা জামিল হিম। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডা: মুকাররাবিন হক নিবিড়।

সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা: সাদিকুর রহমান ইফাতের সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা: মুশতাক হোসেন এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা: সোহেল রেজা চৌধুরী।

মূল বক্তব্যে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৩৫.৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং ১৩-১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার উদ্বেগজনক। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের ‘অকাল’ মৃত্যু হয়, যা দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ।

এতে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি।

মূল বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটা, ডিম ও গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ৩০ থেকে প্রায় ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও তামাকপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম বেড়েছে। একই সময়ে নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ১৫.৩৮ শতাংশ, উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম প্রায় ১১ শতাংশ এবং জর্দার দাম প্রায় ১৩ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতির এই সময়ে তামাকপণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় আরো সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়ে গেছে।

ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, তামাকপণ্যের কার্যকর মূল্য বৃদ্ধি তরুণদের ধূমপান শুরু নিরুৎসাহিত করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের ‘অকাল’ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক ডা: সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ এবং ১৮–২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২২.৩ শতাংশ। তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম মূল্য তরুণদের তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। বর্তমান চার স্তরবিশিষ্ট সিগারেট কর কাঠামো জটিল ও অকার্যকর হওয়ায় ব্যবহারকারীরা সহজেই নিম্নমূল্যের সিগারেটে চলে যেতে পারছেন। তাই কার্যকরভাবে তামাক কর সংস্কার করে তামাকের সহজলভ্যতা কমাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে, যা জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

ডা: সাদিকুর রহমান ইফাত বলেন, কার্যকরভাবে তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হলে লাখো তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে এবং ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগ ও অকাল মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে।