গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
গাজীপুরে ২২ বছর ধরে চলছে একটি ধর্ষণ মামলা। ধর্ষণের ঘটনায় জন্ম নেয়া কন্যা সন্তানের বয়স এখন ২১। তারও বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ মামলার বিচার কাজ শেষ হচ্ছে না। দুই দশকের বেশি সময় আদালতের বারান্দায় কাটিয়ে মামলার বাদির প্রশ্ন, ২২ বছর ধরে মামলা চালাচ্ছি, কত বছরে পাবো ধর্ষণের বিচার?
গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে রোববার (১০ মে) মামলার ১১তম ধার্য তারিখে যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময়ের আবেদন দিলে বিচারক এ কে এম নাসির উদ্দিন নতুন তারিখ নির্ধারণ করে এজলাস ত্যাগ করেন।
নানা কারণে বার বার যুক্তিতর্ক পিছিয়ে যাওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছেন ভুক্তভোগী বিচার প্রত্যাশীরা। দীর্ঘ ২২ বছরেও যুক্তিতর্ক শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাদিপক্ষ। এসময় আদালতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মামলার বাদি ও ভুক্তভোগী নারীর রিকশাচালক বাবা, ভুক্তভোগী নিজে ও তার কন্যা। একপর্যায়ে তারা চিৎকার-চেঁচামেচি ও হট্টগোল শুরু করলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি শান্ত করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাদি বলেন, ‘টাকার কাছে কি সবাই বিক্রি হয়ে যাবে? আমি গরিব মানুষ, রিকশা চালাই, তাই বলে কি আমরা বিচার পাব না? আমার মেয়ের ইজ্জত গেছে, সেই ঘটনায় জন্ম নেয়া নাতনিকে ২১ বছর ধরে কষ্ট করে মানুষ করেছি। এখনো কি তার কোনো স্বীকৃতি মিলবে না?’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন যখন এ আদালতের বিচারক ছিলেন, তখন এ মামলা দায়ের করেছিলাম। এরপর ১০ জন বিচারক বদলি হয়েছেন, কিন্তু বিচার শেষ হয়নি।’
মামলার নথি অনুযায়ী জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন টঙ্গী মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগীর বাবা। মামলায় তার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাড়িওয়ালার ছেলে রুহুল আমীনকে এবং গর্ভপাতের চেষ্টার অভিযোগে তার বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নূরুন্নাহারকে আসামি করা হয়।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ডকৃত জবানবন্দিতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রুহুল ভিকটিমকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। পরে, ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে অভিযুক্তের বাব-মা গর্ভপাত করানোর চেষ্টা করেন।
ভুক্তভোগীর মা জবানবন্দিতে বলেন, অভিযুক্ত রুহুল আমিন তার মেয়েকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এতে তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। অভিযুক্তের বাবা-মা ভুক্তভোগীকে গর্ভপাতের শর্তে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়।
অন্য সাক্ষী তার জবানবন্দিতে জানান, তিনি ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে অবগত হন এবং পরে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সময়ও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, থানা পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর ধর্ষণের অভিযোগে আসামি রুহুল আমীনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুনঃতদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুর। ডিএনএ পরীক্ষাসহ পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পিবিআই মামলার তিন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মামলাটি যুক্তিতর্কের জন্য রাখা হয়। এরপর রোববারসহ মোট ১১ বার যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য হলেও বিভিন্ন অজুহাতে যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়নি বলে বাদিপক্ষ অভিযোগ করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবু তাহের নয়ন বলেন, আমরাও চাই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু বিচারকের আন্তরিকতা না থাকলে আমাদের করার খুব বেশি কিছু থাকে না।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, কিন্তু বাদিপক্ষ আজ আমাকেই ভুল বুঝছে। অথচ, আমি বেশিদিন হয়নি দায়িত্ব নিয়েছি। যারা আগে ছিলেন তারা কী করেছেন?
আদালত-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের নভেম্বরে বর্তমান বিচারক এ কে এম নাসির উদ্দিন এ আদালতে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে মামলাজট কমার গতি সন্তোষজনক নয়।
বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, তারা সকাল থেকে আদালতে উপস্থিত থাকলেও বিচারক দুপুরের পর এজলাসে ওঠেন এবং স্বল্প সময় আদালত পরিচালনা করেন। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক সময় লাগছে।



