স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান

মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট)।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বাস্থ্য বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বাস্থ্য বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা |সংগৃহীত

দেশের স্বাস্থ্য খাতে শুধু বাজেট বাড়ালেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না; বরং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিকদের জন্য শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণ বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট)।

গোলটেবিল বৈঠকে ‘বিয়ন্ড বাজেট অ্যালোকেশন: এনসিউরিং ইফেকটিভ ইউটিলাইজেশন’ শীর্ষক নীতিগত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ এমন একটি স্বাস্থ্য বাজেট প্রত্যাশা করে, যা বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

উপস্থাপনায় বলা হয়, সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়লেও বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এর পেছনে খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সেবার পুনরাবৃত্তি, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভাবকে দায়ী করা হয়।

অধ্যাপক হামিদ বলেন, উল্লেখযোগ্য বাজেট বৃদ্ধির দাবি করার আগে স্বাস্থ্যখাতকে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বরাদ্দের পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বিদ্যমান ফ্যামিলি কার্ডকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করারও প্রস্তাব দেন। তার মতে, এটি চালু হলে হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, যেসব খাতে বেশি ব্যয় প্রয়োজন, সেসব খাতেই বরাদ্দ কম। তিনি পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কম খরচে মেডিকেল পরীক্ষা ও বিনামূল্যে ওষুধপ্রাপ্তির প্রত্যাশা জনগণের রয়েছে। কিন্তু এই খাতে বরাদ্দ কম হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেয়া হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। তাই স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া এবং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ বলেন, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা প্রয়োজন। তিনি প্রান্তিক অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, অনেক মানুষের একদিনের আয়ই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে তারা চিকিৎসাসেবা নিতে অনাগ্রহী হন। এ ধরনের মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন, টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও শতকরা হারে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে না। তিনি আগামী বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বেশি বরাদ্দ দেয়ার আহ্বান জানান।

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্সদের আবাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। তিনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বিভ্রান্তির অভিযোগ তুলে জেলাভিত্তিক টিকার ডোজের হিসাব প্রকাশের দাবি জানান।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সব মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে স্বাস্থ্য কার্ড যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

পাইনেটের কো-অর্ডিনেটর নাজমুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন শিশু ইউরোলজিস্ট ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ শাদরুল আলম, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন, টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম-সম্পাদক দিদার ভূইয়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শিব্বির আহমেদ, বিআইজিএমের সহযোগী অধ্যাপক জোবায়ের আহমেদ, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের দপ্তর সম্পাদক এ কে এম জিয়াউল হক, বিআইজিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবায়ের আহমেদ, ডক্টরস্ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মোবারক হোসেন প্রমুখ।