প্রধানমন্ত্রী

উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর

‘জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান |বাসস

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে তার সরকার বদ্ধপরিকর।

তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও এই কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবুও সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।’

শনিবার (১৮ এপ্রিল) ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল চিকিৎসক ও কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসা পেশার গুরুত্ব যেকোনো পেশার চেয়ে বেশি এবং বর্তমান সরকার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকগণ রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু এবং বিপদের প্রকৃত সঙ্গী। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’

বর্তমান সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে আগে আমরা জনগণের কাছে স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ বা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আমরা যদি রোগের শুরুতেই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি তাহলে রোগের বিস্তার মোকাবেলা সম্ভব। আমাদের এই নীতি বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে প্রণীত ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ যেমন- শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হৃদরোগ ইত্যাদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে উপজেলা পর্যায়েই গুরুত্বসহকারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং নিয়মিত করা প্রয়োজন। জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করার ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি জরুরি।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে ইউএইচএফপিও অর্থাৎ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।’

‘মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কর্মযজ্ঞে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সদস্যগণ প্রথম সারির যোদ্ধা। হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট ও হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট এর একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।’

তিনি বলেন, ‘একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার কাজটিও সূচারুভাবে সম্পন্ন করতে হয়। কারণ, হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট ও হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সমউন্নয়ন না হলে স্বাস্থ্য সেবায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।’

দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’

‘আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ’ আমেরিকার বিখ্যাত পুষ্টিবিদ পরলোকগত জ্যাক লালেনের উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এনএইচএস’র জেনারেল প্র্যাকটিশনার-জিপি’র আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করার চিন্তা রয়েছে।’

“এই স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে এক লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই হেলথ কেয়ারারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। হেলথ কেয়ারাররা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথ কেয়ার দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন’ উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যতের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে হবে।’

সারাদেশে শিশুদেরকে হামের টিকা না দেয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য আমি সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ সকলকে ধন্যবাদ জানাই। যারা তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেই সকল পিতামাতা ও স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।’

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা রক্ষায় সরকার আন্তরিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারেও সরকার সাধ্যমতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধপরিকর।’

সবশেষে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি বার্তা দিতে চাই, সেটি হলো- প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন। আপনারা একটি জবাবদিহিমূলক, টেকসই ও জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। আপনাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার কর্মস্থলকে একটি মডেল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত করবেন, আপনাদের কাছে এই প্রত্যাশা।’

মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের কার্যক্রমকে যুগোপযোগী করা, সার্বিক কার্যক্রম অবহিত হওয়াসহ সরকারের নির্দেশনা তাদের কাছে দেয়ার জন্য এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাস।

এছাড়াও সারা দেশ থেকে আসা পাঁচ শতাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এতে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত জরুরী সেবা ক্যটাগরিতে মনোনয়প্রাপ্ত ছয়জন ডাক্তারের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সাথে এবারই প্রথম বৈঠক করেন।

সূত্র : বাসস