দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার আগের তুলনায় কমলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। প্রতি বছর এখনো লাখ লাখ মানুষ কুকর-বিড়ালের মতো প্রাণীর কামড়ের শিকার হচ্ছেন, আর অবহেলার কারণে বছরে প্রায় অর্ধশত মানুষ এই রোগে মৃত্যুর মুখে পড়ছেন।
ভাইরাসজনিত রোগ জলাতঙ্ক, ইংলিশে র্যাবিস, মূলত সংক্রমিত প্রাণীর লালা থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। একসময় কুকুরের কামড় থেকে জলাতঙ্ক বেশি হলেও বর্তমানে বিড়ালসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় থেকেও সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে।
প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে তা মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো একবার লক্ষণ প্রকাশ হয়ে গেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। কারণ লক্ষণ প্রকাশের পর এর কোনো চিকিৎসা নেই বললেই চলে।
তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে ক্ষত পরিষ্কার করা, দ্রুত টিকা নেয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এই প্রতিবেদনে জলাতঙ্কের লক্ষণ, প্রতিকার, প্রতিরোধের বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।
প্রতিবছর যত মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়
ভাইরাসজনিত রোগ জলাতঙ্ক মূলত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, সেখানে যেসব প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলাতঙ্ক পাওয়া যায় সেগুলো হলো– বাদুড়, স্কাঙ্ক, র্যাকুন ও শিয়াল।
প্রতি বছর সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে সেখানে প্রায় এক লাখ মানুষ জলাতঙ্কের টিকা নেন।
তবে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিডিসি (কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মূলত কুকুর ও বিড়ালের কামড় ও আঁচড় থেকে এটি ছড়ায়। এছাড়া বেজি ও শিয়ালের থেকেও জলাতঙ্ক ছড়াতে পারে।
গত বছর দেশে প্রায় সাত থেকে আট লাখ মানুষ প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কামড় দেয় বিড়াল, আর ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুর।
এর কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিডিসি বিভাগের ডিজিজ কন্ট্রোল পরিচালক অধ্যাপক ডা: মো: হালিমুর রশিদ বলেছেন, এখন কুকুরের চেয়ে বিড়ালের কামড় বেশি খায় মানুষ, কারণ ঘরে ঘরে মানুষ এখন বিড়াল পালে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: মুশতাক হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশে এসব প্রাণী বেশি পাওয়া যায় বলে এগুলোর নাম আসছে। কিন্তু যেকোনো সংক্রমিত বন্য প্রাণীর লালা থেকে মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হতে পারে।
লক্ষণ দেখা দিলেই মৃত্যু প্রায় অনিবার্য
ডা: মো: হালিমুর রশিদ বলেছেন, বাংলাদেশে একসময় জলাতঙ্কে বছরে গড়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ আক্রান্ত হতো। এখন তা কমে বছরে প্রায় ৫০ জনে নেমে এসেছে।
তিনি জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে যেখানে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ডোজ টিকার প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে এ বছর তা বেড়ে প্রায় ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডা: মুশতাক হোসেন বলেছেন, মানুষ সাধারণত সরাসরি এই রোগে আক্রান্ত হয় না। সংক্রমিত প্রাণী না কামড়ালে বা না আঁচড়ালে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই।
আক্রান্ত প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলেই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় খোলা ক্ষত স্থানে বা চোখ-মুখের ঝিল্লিতে লালা লাগলেও সংক্রমণ হতে পারে।
ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর ধীরে ধীরে তা স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং লক্ষণ শুরুর আগে চিকিৎসা না নিলে মস্তিষ্কজনিত সমস্যা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির তথ্য বলছে, সংক্রমণ থেকে লক্ষণ প্রকাশ পর্যন্ত যে সময় লাগে, তাকে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়। এটি কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে।
এই সময়টাতে সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে একবার লক্ষণ শুরু হলে এই রোগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত ফ্লুর মতো হয়। যেমন– দুর্বলতা বা অস্বস্তি, জ্বর ও মাথাব্যথা। কামড়ের স্থানে ব্যথা, ঝিনঝিনে অনুভূতি বা চুলকানিও হতে পারে।
সাধারণত প্রথম লক্ষণের দুই সপ্তাহের মধ্যেই রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করে। তখন আচরণগত পরিবর্তন, যেমন– উদ্বেগ, বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও হ্যালুসিনেশন দেখা দিতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে তীব্র তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও পানি দেখলে ভয় লাগে। অতিরিক্ত লালা পড়া এবং আক্রমণাত্মক আচরণ, যেমন– ছটফট করা বা কামড়ানোর প্রবণতাও দেখা যায়। কারো আবার বাতাসের ভয়ও তৈরি হয়। কারো ক্ষেত্রে খিঁচুনি বা প্যারালাইসিস দেখা দেয়।
এ বিষয়ে ডা: মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘লক্ষণের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। লক্ষণ দেখা দেয়া মানেই আপনার বাঁচার সম্ভাবনা কম। লক্ষণ মানে মস্তিষ্কের প্রদাহ। তখন রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করা শুরু করবে এবং প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু।’
যুক্তরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, খুবই বিরল ক্ষেত্রে কেউ বেঁচে গেলেও তাদের অধিকাংশের গুরুতর মস্তিষ্কজনিত জটিলতা থেকে যায়।
কামড়ের পর করণীয় ও চিকিৎসা
লক্ষণ প্রকাশের পর জলাতঙ্কের চিকিৎসা খুবই সীমিত এবং বেশিভাগ ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। তাই এটিকে প্রায় অবধারিতভাবে মারাত্মক রোগ হিসেবে ধরা হয়। আর এই কারণেই জলাতঙ্ককে প্রতিরোধযোগ্য হলেও অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগ বলা হয়।
সেকারণে কোনো প্রাণী কাউকে আক্রমণ করলে দেরি না করে সাথে সাথে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল বা এই বিষয়ক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা: মুশতাক হোসেন।
তবে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে আক্রমণের পর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সাথে সাথে ক্ষত স্থান অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। সাবান দিয়ে ধুলেও হবে। তা না থাকলে শুধু পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি যাওয়া সম্ভব না হলে টেলিফোন করে হেল্পলাইনেও সাহায্য নিতে পারে। কারণ জলাতঙ্কের ইঞ্জেকশন ফার্মেসিতে পাওয়া যায়, তখন হয়তো ডাক্তার বলে দেবে যে আপনি ওই ইঞ্জেকশন দিয়ে তারপর আমার কাছে আসেন।’
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, যদি কারো জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এই চিকিৎসাকে বলা হয় পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস (পিইপি)।
এতে ক্ষত পরিষ্কার করা, হিউম্যান র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন দেয়া এবং চার বা পাঁচ ডোজের টিকা দেয়া অন্তর্ভুক্ত থাকে। সম্ভাব্য সংক্রমণের পর যত দ্রুত সম্ভব এই চিকিৎসা শুরু করতে হয়।
সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা নেয়া হলে এটি প্রায় শতভাগ কার্যকরভাবে রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসার পর আর টিকা নেন না, যা বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
কিন্তু কোনো প্রাণী আক্রমণ করলেই টিকা নেয়া কি বাধ্যতামূলক জানতে চাইলে ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ওই প্রাণী র্যাবিস সংক্রমণের কোন পর্যায়ে আছে বা আগে থেকে তার ভ্যাকসিন দেয়া আছে কি-না, এসব বিবেচনা করা যেতে পারে যদি সাথে সাথে ওই প্রাণীটিকে পাওয়া যায়। কিন্তু বেশিভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না, পালিয়ে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘কামড় বা আঁচড়ের পর থেকে যাওয়া লালা থেকেও এটা সাথে সাথে পরীক্ষা করা যাবে না। ভাইরাস যদি শরীরে প্রবেশের পর ডেভেলপ না করে, সাথে সাথে রেজাল্ট আসবে না। আর যখন ডেভেলপ করবে, তখন শেষ সব। তাই র্যাবিস হোক, তারপর ভাইরাস চিহ্নিত করব; রোগীকে মেরে ফেলে তো এটা করতে পারি না। সেজন্য অনুমান করে দেয়া হয়।’
প্রতিরোধ ও টিকা
জলাতঙ্ক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা ও টিকাদান। পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দেয়া এবং রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সিডিসির তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কারণে জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের সংখ্যা খুবই কম। তবে বিশ্বব্যাপী চিত্র ভিন্ন। প্রতি বছর জলাতঙ্কে আনুমানিক ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর মধ্যে ৯৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে দায়ী গৃহপালিত কুকুর।
এদিকে যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএস বলছে যে, জলাতঙ্ক সারা বিশ্বেই পাওয়া গেলেও যুক্তরাজ্যে এটি খুবই বিরল। সেখানে শুধু কিছু বাদুড়ের মধ্যেই জলাতঙ্ক পাওয়া যায়।
তবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে জলাতঙ্ক বেশি দেখা যায়। এসব অঞ্চলে কুকুর, বাদুড়, র্যাকুন ও শিয়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। যুক্তরাজ্যে সাধারণত শুধু কিছু বাদুড়ের মধ্যেই জলাতঙ্ক পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে ডা: মুশতাক আহমেদ বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকায় পোষা প্রাণী মানেই মালিকানাধীন প্রাণী। গলায় পরিচয় থাকে। ওরা ভ্যাকসিন দিয়ে রাখে। কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকার মতো অঞ্চলে প্রাণীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রেও না।’
যাদের জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি– যেমন, পশুচিকিৎসক, প্রাণী নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তি বা যাদের প্রাণীর সংস্পর্শে বেশি থাকতে হয়, তাদের বাড়তি সুরক্ষার জন্য আগে থেকেই (প্রি-এক্সপোজার) টিকা নেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
শিশুদের শেখাতে হবে যাতে তারা অপরিচিত প্রাণীর কাছাকাছি না যায় বা উসকানি না দেয়।
এদিকে, র্যাবিসের টিকার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যেমন- জ্বর, ব্যথা ইত্যাদি।
সূত্র: বিবিসি



