যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী হত্যা : আটক অভিযুক্ত সম্পর্কে যা জানা গেল

শুক্রবার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কলিন ব্রিজের কাছ থেকে জামিল লিমনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়ায় কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, এখনো তা পুলিশ জানায়নি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সন্দেহভাজন হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহ
সন্দেহভাজন হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহ |সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর মধ্যে এখনো নিখোঁজ থাকা নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির ভাই জানিয়েছেন যে, তার বোন জীবিত নেই বলে মার্কিন পুলিশ জানিয়েছে। এর আগে নিখোঁজ অপর শিক্ষার্থী জামিল লিমনের লাশ ফ্লোরিডার কাছের ট্যাম্পা বে’র একটি সেতু থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তার রুমমেটকে আটক করা হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঢাকায় থাকা বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্তের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবিসিকে জানান, ‘পুলিশ এখনো লাশ না পেলেও সন্দেহভাজনের অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।’

তাদের পরিবারকে শনিবার ভোরবেলা ফোন করে সেটি জানানো হয়েছে।

শুক্রবার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কলিন ব্রিজের কাছ থেকে জামিল লিমনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়ায় কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, এখনো তা পুলিশ জানায়নি।

তবে নাহিদা বৃষ্টির লাশ পাওয়া গেছে কিনা, সেই বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি।

নিহত দুই শিক্ষার্থী পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত ১৬ এপ্রিল সর্বশেষ জামিল ও নাহিদাকে দেখা যায়।

এর পর থেকে তাদের বন্ধু বা স্বজনরা যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। এরপর থেকে পুলিশ তদন্ত করতে শুরু করে।

এই ঘটনায় জামিল লিমনের রুমমেট, ২৬ বছর বয়সী হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহকে ক্যাম্পাসের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্টে আটক করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা, অবৈধভাবে লাশ সরানো, মৃত্যুর খবর না দেয়া, প্রমাণ নষ্ট করা, জোর করে আটকে রাখা এবং হামলা চালানো।

তাকে আটকের পর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কলিন ব্রিজের কাছে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এরপর জামিল লিমনের লাশ পাওয়া যায়।

জামিল লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন, আর নিখোঁজ বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী।

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, আবুঘারবেইহের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার গ্রেফতারের রেকর্ড রয়েছে।

পুলিশ জানায়, ক্যাম্পাস থেকে প্রায় এক মাইল দূরের একটি বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথমে তারা সন্দেহভাজন হিশাম সালেহ পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

তবে হিশাম সালেহ নিজেকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখে এবং বের হতে অস্বীকৃতি জানায়।

তাকে আটকের কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেছে কাউন্টি শেরিফ অফিস।

এরপর সোয়াট দল ঘটনাস্থলে যায়, পুলিশ ড্রোন ব্যবহার করে এবং প্রশিক্ষিত নেগোশিয়েটর বা আলোচককেও ডাকা হয়। শেষে সন্দেহভাজন শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে।

এর আগে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললেও এক পর্যায়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।

বর্তমানে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগে গোয়েন্দাদের সাথে কথা বলছে বলে জানান হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিসের চিফ ডেপুটি জোসেফ মাওরার।

কিভাবে তাকে আটক করা হয় তার বর্ণনা দিয়ে মাওয়ার বলেন, ‘আজ সকাল (২৪ এপ্রিল) প্রায় ৯টার দিকে আমরা একটি পারিবারিক সহিংসতার কল পাই। আমাদের ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। আমরা জানতাম এটি সন্দেহভাজনের বাসা।’

‘আমরা পরিবারের সদস্যদের বাসা থেকে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হই। এরপর আমরা সন্দেহভাজনকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিই।’

‘সে তা মানেনি। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তাকে বারবার বের হয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হয়, কিন্তু সে কোনো সাড়া দেয়নি।’

‘এরপর সোয়াত (SWAT) দল মোতায়েন করা হয়। সকাল প্রায় ১০টা ৩৬ মিনিটে সোয়াত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।’

‘তারা আবার সন্দেহভাজনকে বের হয়ে আসার নির্দেশ দেয়। এরপর সে শান্তিপূর্ণভাবে বের হয়ে আসে এবং তাকে হেফাজতে নেয়া হয়।’

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিসের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বৃষ্টিকে খুঁজতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। সেতুর আশপাশে পানিতে ডুবুরি দল অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

শেরিফ অফিসের বরাত দিয়ে সিবিএস জানিয়েছে, আবুঘারবেইহ আগে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী ছিলেন, তবে বর্তমানে তিনি এনরোল্ড ছিলেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালের বসন্ত থেকে ২০২৩ সালের বসন্ত পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেছেন এবং ম্যানেজমেন্টে বিএস ডিগ্রি নিচ্ছিলেন।

শেরিফ অফিস জানায়, ২৬ বছর বয়সী আবুঘারবেইহের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার গ্রেফতারের রেকর্ড রয়েছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে হামলা এবং ফাঁকা বাড়িতে চুরি (বার্গলারি) করার অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের মে মাসে তার বিরুদ্ধে আরো একটি হামলার অভিযোগ ছিল, যেগুলো আদালতের নথিতে মিসডিমিনর বা কম গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলোয় বলা হয়েছে, আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রথমবার অপরাধে অভিযুক্তদের জন্য একটি ডাইভারশন প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। ২০২৪ সালে সেটি সম্পন্ন করার পর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এ বিষয়ে তার আইনজীবীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

হিলসবরো কাউন্টির আদালতের নথিতে আরো দেখা যায়, ২০২৩ সালে তার পরিবারের একজন সদস্য দুটি পারিবারিক সহিংসতার আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি মামলায় বিচারক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, আর অন্যটি খারিজ করে দেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি