ফ্রান্সে ‘আনেফ’ প্ল্যাটফর্ম সঙ্কট : সমাধানের নির্দেশ আদালতের

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত ‘কঁসেই দে-তা’ নির্দেশ দিয়েছে, অভিবাসীদের রেসিডেন্স পারমিটের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সব সমস্যা ৬ মাসের মধ্যে ঠিক করতে হবে, কারণ প্রযুক্তিগত জটিলতায় বহু মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সে অভিবাসীদের রেসিডেন্স পারমিট বা ‘কার্ত দ্য সেজুর’ আবেদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান জটিলতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কঁসেই দে-তা। আদালত সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আনেফ প্ল্যাটফর্মের সব কারিগরি ত্রুটি ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে এবং আবেদন প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।

ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপি ও ইউরোপে অভিবাসন-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসের সূত্র মতে, বর্তমানে ফ্রান্সে রেসিডেন্স পারমিট-সংক্রান্ত প্রায় সব কার্যক্রমই এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আবেদন, নবায়ন, ঠিকানা পরিবর্তন বা পারিবারিক তথ্য হালনাগাদ সবই অনলাইনে করতে হয়। কিন্তু এই সিস্টেমে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা যাচ্ছে। আবেদন জমা না হওয়া, দীর্ঘ সময় কোনো উত্তর না পাওয়া এবং তথ্য হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার কারণে হাজারো অভিবাসী ভয়াবহ ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই সমস্যার কারণে অনেক অভিবাসী তাদের বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কেউ চাকরি হারাচ্ছেন, কেউ বাসা ভাড়া নবায়নে সমস্যায় পড়ছেন, আবার কেউ সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কয়েকটি মানবাধিকার ও অভিবাসী সহায়তা সংগঠন আদালতে আবেদন করে।

তাদের দাবি ছিল, এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অভিবাসীদের অধিকারকে কার্যত সীমিত করে ফেলেছে। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে লা সিমাদ এবং ফেদেরাসিয়োঁ দে জ্যাকতর দ্য লা সলিদারিতে। আদালত তাদের যুক্তির সাথে একমত হয়ে বলে, বর্তমান ব্যবস্থাটি প্রশাসনিক সেবার ন্যূনতম মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আদালত আরো উল্লেখ করেছে, আবেদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ার কারণে অনেকেই অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই অবস্থায় অস্থায়ী অনুমতি বা এপিআই ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে কাজ করছে না, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে বৈধভাবে কাজ করার অধিকার থাকলেও অনেক অভিবাসী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।

এই বিষয়ে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। আফগানিস্তান থেকে আসা জওয়াদ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও কোনো সাড়া পাননি বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশী অভিবাসী আবু ইউসুফ জানান, তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আবেদন করলেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।

অন্যদিকে সহায়তা সংস্থাগুলোর কর্মীরা বলছেন, সিস্টেমে দেয়া তথ্য অনেক সময় সংরক্ষিতই হয় না, ফলে আবেদন আটকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ফোন বা অনলাইন সহায়তাও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

মানবাধিকার সংস্থা দেফঁসুর দে দ্রোয়া আগেই সতর্ক করেছিল যে অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা মানবিক প্রশাসনিক সেবাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাদের মতে, প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বিকল্প মানবিক সেবা যেমন সরাসরি যোগাযোগ, ফোন বা কাগজপত্র জমা দেয়ার সুযোগ অবশ্যই রাখতে হবে।

আদালতও একই অবস্থান নিয়েছে এবং বলেছে, যতদিন পুরো ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ না করবে, ততদিন কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। বিশেষ করে আবেদন প্রক্রিয়ার সময় অস্থায়ী অনুমতি যথাসময়ে প্রদান ও নবায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

এই রায়কে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা বলছে, এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে একই সাথে তারা মনে করছে, আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই নির্দেশনা কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

ফলাফল হিসেবে আগামী ছয় মাস ফরাসি প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে নির্ধারণ হবে ডিজিটাল অভিবাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আদৌ কতটা মানবিক ও কার্যকর হতে পারবে।